17.9 C
London
August 22, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

মানুষ কমছেঃ তাই ইমিগ্র্যান্ট চায় যুক্তরাজ্যের এক শহর

স্কটল্যান্ডের পশ্চিম উপকূলের বন্দরনগরী গ্রিনক দীর্ঘদিন ধরে জনসংখ্যা সংকটের সঙ্গে লড়াই করছে। শিল্পভিত্তিক অর্থনীতির পতন, কমে যাওয়া জন্মহার, তরুণ ও কর্মক্ষম মানুষের অন্যত্র চলে যাওয়া এবং বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় শহরটির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইনভারক্লাইড কাউন্সিল নতুন বাসিন্দা হিসেবে অভিবাসী ও শরণার্থীদের স্বাগত জানানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।

গ্রিনক ইনভারক্লাইড কাউন্সিল এলাকার প্রধান শহর। দীর্ঘদিন ধরে জনসংখ্যা কমতে থাকা এই অঞ্চলে একসময় জাহাজ নির্মাণ, বন্দর কার্যক্রম, চিনি শিল্পসহ বিভিন্ন বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিপুল কর্মসংস্থান তৈরি করত। শিল্পায়নের সময় এসব কর্মসংস্থানের টানে স্কটল্যান্ডের বিভিন্ন অঞ্চল এবং দেশের বাইর থেকেও মানুষ এখানে এসে বসতি গড়েছিলেন। কিন্তু শিল্পের পতনের সঙ্গে সঙ্গে সেই জনসংখ্যা বৃদ্ধির ধারাও উল্টে যায়।

ইনভারক্লাইড কাউন্সিলের সাম্প্রতিক নথিতে বলা হয়েছে, ১৯৫১ সালে অঞ্চলটির জনসংখ্যা সর্বোচ্চ প্রায় ১ লাখ ৩৭ হাজারে পৌঁছেছিল। এরপর কয়েক দশকে তা দ্রুত কমে আসে। ১৯৫১ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে জনসংখ্যা প্রায় ৪০ শতাংশ কমে প্রায় ৮০ হাজারে নেমে আসে। ১৯৮১ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যেই কমেছিল প্রায় ২১ হাজার মানুষ।

বর্তমান সংকটের পেছনে শুধু মানুষের অন্যত্র চলে যাওয়াই দায়ী নয়; জন্মহার কমে যাওয়াও বড় কারণ। কাউন্সিলের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইনভারক্লাইডে বছরে জন্ম নেওয়া শিশুর সংখ্যা ১৯৯১ সালের ১ হাজার ১৮৫ থেকে ২০২৪ সালে ৫৯৪-এ নেমে এসেছে—অর্থাৎ তিন দশকের কিছু বেশি সময়ে তা প্রায় অর্ধেকে নেমেছে।

জন্ম ও মৃত্যুর ব্যবধানও জনসংখ্যা সংকটকে আরও তীব্র করছে। ২০২০-২১ সালে ইনভারক্লাইডে মাত্র ৫৭০টি জন্মের বিপরীতে ১ হাজার ১৩টি মৃত্যু হয়েছিল। ফলে স্বাভাবিক জনসংখ্যা পরিবর্তনে ৪৪৩ জনের ঘাটতি তৈরি হয়। যদিও ওই বছর অভিবাসনের কারণে বাইরে থেকে আসা মানুষের সংখ্যা বাইরে চলে যাওয়া মানুষের তুলনায় কিছুটা বেশি ছিল।

আরও সাম্প্রতিক তথ্যেও একই প্রবণতা দেখা যায়। ২০২২-২৩ সালে ইনভারক্লাইডে ৬২৬টি জন্মের বিপরীতে ১ হাজার ১৭৪টি মৃত্যু হয়। অর্থাৎ স্বাভাবিক জনসংখ্যা পরিবর্তনের ফলে ৫৪৮ জন কমে যায়। তবে ওই সময়ে অভিবাসন পরিস্থিতি ছিল ইতিবাচক—প্রায় ১ হাজার ৯৪০ জন এলাকায় এসেছিলেন এবং ১ হাজার ৪৪০ জন চলে গিয়েছিলেন, ফলে নিট অভিবাসন ছিল প্রায় ৫০০ জন। নতুন আসা মানুষের মধ্যে ৬২০ জন ছিলেন আন্তর্জাতিক অভিবাসী।

এই পরিসংখ্যানটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দেখায় যে বিদেশ থেকে মানুষের আগমন ইতোমধ্যে জনসংখ্যা কমার একটি অংশ সামাল দিতে ভূমিকা রাখছে। কাউন্সিলের নিজস্ব বিশ্লেষণেও ভবিষ্যৎ জনসংখ্যা ধরে রাখতে এবং অর্থনৈতিক পতন মোকাবিলায় কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী আকর্ষণ ও ধরে রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।

তবে সমস্যার আরেকটি বড় দিক হলো গ্রিনক ও বৃহত্তর ইনভারক্লাইডের অর্থনৈতিক দুর্বলতা। শিল্পায়নের সময় বড় নিয়োগদাতাদের ওপর নির্ভরশীল থাকা অঞ্চলটি পরবর্তী সময়ে একের পর এক কর্মসংস্থানের ধাক্কা সামলেছে। কাউন্সিলের সাম্প্রতিক নথি অনুযায়ী, আইবিএম ২০২৩ সালে গ্রিনকে তাদের শেষ অবশিষ্ট স্থাপনাটিও বন্ধ করে দেয়। প্রতিষ্ঠানটি ২০০০ সালের শুরুতে ওই এলাকায় প্রায় ৫ হাজার ৫০০ মানুষকে কর্মসংস্থান দিয়েছিল। অন্যান্য বড় নিয়োগদাতার সরে যাওয়ায় আরও প্রায় ১ হাজার ৩০০ কর্মসংস্থান হারিয়েছে অঞ্চলটি।

ব্যবসা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও অঞ্চলটি পিছিয়ে রয়েছে। কাউন্সিলের হিসাব অনুযায়ী, ইনভারক্লাইডে সক্রিয় ব্যবসা ও নতুন ব্যবসা শুরুর হার স্কটল্যান্ডের গড়ের তুলনায় কম। জাতীয় ও আঞ্চলিক গড়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলে যে সংখ্যক ব্যবসা থাকার কথা, তার তুলনায় এখানে প্রায় ৭৫০টি ব্যবসা কম রয়েছে।

জনসংখ্যার পাশাপাশি বয়সের কাঠামোও বদলে যাচ্ছে। ২০২২ থেকে ২০৩২ সালের মধ্যে ইনভারক্লাইডের কর্মক্ষম বয়সী জনগোষ্ঠী প্রায় ১৫ শতাংশ কমে যাওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। একই সময়ে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী জনগোষ্ঠী প্রায় ১৮ শতাংশ বাড়তে পারে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে কম সংখ্যক কর্মক্ষম মানুষকে বেশি বয়স্ক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য, পরিচর্যা ও সামাজিক সেবার চাহিদা সামলাতে হতে পারে।

সামগ্রিক জনসংখ্যার ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি আশাব্যঞ্জক নয়। কাউন্সিলের আবাসন কৌশল অনুযায়ী, ২০২২ সালে প্রায় ৭৬ হাজার ৩১৩ জনের জনসংখ্যা থেকে ২০৩২ সালে তা প্রায় ৭১ হাজার ৪১৩-তে নেমে যেতে পারে—প্রায় ৬ শতাংশ হ্রাস। অন্যদিকে একই সময়ে স্কটল্যান্ডের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১ শতাংশ বাড়ার পূর্বাভাস রয়েছে।

আরও দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে ২০২১ থেকে ২০৪৩ সালের মধ্যে ইনভারক্লাইডের জনসংখ্যা প্রায় ১৫ শতাংশ কমতে পারে বলে কাউন্সিল জানিয়েছে। একই সময়ে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। ৬৫ থেকে ৮৪ বছর বয়সীদের সংখ্যা প্রায় ১৫ শতাংশ এবং ৮৫ বছরের বেশি বয়সীদের সংখ্যা প্রায় ৪৮ শতাংশ বাড়ার পূর্বাভাস রয়েছে।

জনসংখ্যা কমে যাওয়ার প্রভাব শুধু বাসাবাড়ি বা পরিসংখ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। কম মানুষ মানে স্থানীয় দোকান, ব্যবসা, বিদ্যালয়, পরিবহন এবং অন্যান্য জনসেবার ওপর চাপ ও চাহিদার ধরন বদলে যাওয়া। একই সঙ্গে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমে গেলে স্থানীয় অর্থনীতিতে শ্রমিকের ঘাটতি তৈরি হতে পারে এবং বয়স্ক জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্য ও সামাজিক পরিচর্যার চাহিদা বাড়তে পারে।

তাই নতুন অভিবাসী ও শরণার্থীদের স্বাগত জানানোর নীতিকে শুধু অভিবাসন নীতি হিসেবে নয়, জনসংখ্যা ও অর্থনীতি পুনরুজ্জীবনের বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিদেশ থেকে কর্মক্ষম মানুষ এসে বসতি স্থাপন করলে তারা স্থানীয় শ্রমবাজার, ব্যবসা, ভোক্তা চাহিদা এবং জনজীবনে নতুন গতি আনতে পারেন।

তবে এই উদ্যোগ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়াও রয়েছে। কিছু বাসিন্দা মনে করেন, নতুন মানুষ ও নতুন পরিবার আসা শহরের জনজীবন ও অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারে। অন্যদিকে কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা, জীবনযাত্রার মান, আবাসন এবং স্থানীয় পরিষেবার ওপর সম্ভাব্য চাপ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

তবে জনসংখ্যার দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা বলছে, গ্রিনকের সংকট কেবল অভিবাসন দিয়ে সমাধান করা যাবে না। জন্মহার বাড়ানো, তরুণদের ধরে রাখার মতো কর্মসংস্থান তৈরি, নতুন ব্যবসা আকর্ষণ, আবাসন উন্নয়ন এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে পুনর্গঠন—সবকিছুর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

ইনভারক্লাইডের ক্ষেত্রে অভিবাসন ইতোমধ্যে জনসংখ্যা কমার গতি কিছুটা ঠেকাতে ভূমিকা রাখছে। এখন বড় প্রশ্ন হলো, নতুন অভিবাসী ও শরণার্থীদের স্বাগত জানানোর পাশাপাশি গ্রিনক কি এমন একটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশ তৈরি করতে পারবে, যেখানে শুধু নতুন মানুষ আসবে না, বরং তরুণ স্থানীয় বাসিন্দারাও ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য শহরটিতে থেকে যেতে চাইবেন।

সূত্রঃ ইনভারক্লাইড কাউন্সিল

এম.কে

আরো পড়ুন

টিকটকে নাইজেল ফারাজকে হত্যার হুমকি, ছোট নৌকায় আসা আফগান তরুণ দোষী সাব্যস্ত

যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড স্ট্রিটে যান চলাচল বন্ধ, পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত হচ্ছে সড়ক

যে কারণে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সম্মাননা পেলেন করণ জোহর