ইংল্যান্ডে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের নিবন্ধনহীন ও অবৈধ কেয়ার হোমে রাখার জন্য স্থানীয় কাউন্সিলগুলো বছরে ১২৫ মিলিয়ন পাউন্ডের বেশি করদাতাদের অর্থ ব্যয় করছে। দ্য গার্ডিয়ান ও ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজমের যৌথ তদন্তে এ তথ্য উঠে এসেছে।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অর্থ প্রদানের রেকর্ড বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত দুই বছরে ৪৮০টির বেশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে ২৫০ মিলিয়ন পাউন্ড দেওয়া হয়েছে। এসব অর্থের মাধ্যমে প্রায় ১ হাজার ৮০০টি অবৈধ প্লেসমেন্টে শিশুদের রাখা হয়েছে।
ইংল্যান্ডে অফস্টেডে নিবন্ধিত নয় এমন শিশুদের কেয়ার হোম পরিচালনা করা ফৌজদারি অপরাধ। তারপরও নিবন্ধিত কেয়ার হোমে পর্যাপ্ত জায়গার সংকটের কারণে দেশের প্রায় সব কাউন্সিল কোনো না কোনোভাবে অনিবন্ধিত কেয়ার ব্যবস্থার ব্যবহার করছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, গুরুতর মানসিক আঘাতপ্রাপ্ত এবং জটিল আচরণগত সমস্যায় থাকা বয়স্ক শিশুদের জন্য উপযুক্ত নিবন্ধিত কেয়ার হোমের সংখ্যা পর্যাপ্ত নয়। ফলে এসব শিশুদের রাখার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে অনিবন্ধিত স্থাপনা ব্যবহার করতে হচ্ছে।
তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, কিছু কেয়ার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে ব্যর্থতার অভিযোগ থাকলেও তাদের কাছে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ গেছে। এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের কাছে ৪০ মিলিয়ন পাউন্ডের বেশি সরকারি অর্থ যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
কিছু শিশুর সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধান প্রয়োজন হওয়ায় একাধিক কেয়ার কর্মী নিয়োগ করতে হয়। এর ফলে একটি প্লেসমেন্টের খরচ অনেক বেড়ে যেতে পারে। তদন্তে দেখা গেছে, অন্তত নয়টি কাউন্সিল একটি শিশুর প্লেসমেন্টের জন্য ১ মিলিয়ন পাউন্ডের বেশি অর্থ দিয়েছে।
প্রতি প্লেসমেন্টে গড়ে ১ লাখ ৫০ হাজার পাউন্ডের বেশি আয় হওয়ার কারণে কেয়ার খাতের বাইরের ব্যবসায়ীরাও এই বাজারে প্রবেশ করেছেন। তদন্তে সম্পত্তি ব্যবসায়ী, নির্মাণ ব্যবসায়ী, নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের মালিক, সংগীতশিল্পী এবং সাবেক সামরিক সদস্যদের এমন কেয়ার ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
ইংল্যান্ডের শিশু কমিশনার র্যাচেল ডি সুজা বলেছেন, এসব তথ্য শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থায় কাঠামোগত ব্যর্থতার বিষয়টি সামনে এনেছে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ শিশু কেয়ার হোমগুলো পর্যাপ্ত তদারকি ছাড়াই পরিচালিত হয়েছে এবং সেসব প্লেসমেন্টে বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয় হয়েছে।
তদন্তে প্রসপেরো হেলথ অ্যান্ড সোশ্যাল কেয়ারকে অবৈধ কেয়ার ব্যবস্থায় কর্মী সরবরাহকারী বড় প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গত দুই বছরে ১৪টি কাউন্সিল প্রতিষ্ঠানটিকে ৭.৬ মিলিয়ন পাউন্ড দিয়েছে। এর মাধ্যমে ৮৬টি অনিবন্ধিত শিশু কেয়ার প্লেসমেন্টে কর্মী সরবরাহ করা হয়েছে।
প্রসপেরো জানিয়েছে, তারা কোনো অনিবন্ধিত কেয়ার হোম পরিচালনা করে না। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তারা শুধু কর্মী সরবরাহ করেছে এবং শিশুদের প্লেসমেন্ট, মূল্যায়ন, কেয়ার পরিকল্পনা ও তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট স্থানীয় কর্তৃপক্ষের।
তবে অফস্টেড জানিয়েছে, কোনো এজেন্সির কর্মীরা যদি প্রতিদিন কোনো স্থাপনায় উপস্থিত থেকে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কর্মীদের অনুপস্থিতিতে সেটি পরিচালনা করেন, তাহলে ওই এজেন্সিও কেয়ার হোম পরিচালনার জন্য দায়ী হতে পারে।
অফস্টেডের তথ্য অনুযায়ী, ইংল্যান্ডে শনাক্ত অবৈধ শিশু কেয়ার হোমের সংখ্যা ২০২০ সালের ১৪৪টি থেকে বেড়ে চলতি বছরে ৭১০টিতে পৌঁছেছে। কেয়ার ব্যবস্থায় থাকা শিশুদের প্রায় ১০ শতাংশ কোনো সময়ে অনিবন্ধিত স্থাপনায় বসবাস করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় কর্তৃপক্ষ অবৈধ কেয়ার হোমের বিরুদ্ধে অবস্থান আরও কঠোর করেছে। গত মাসে অফস্টেড প্রথমবারের মতো একটি অনিবন্ধিত শিশু কেয়ার হোম পরিচালনার ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত করার ঘটনা ঘটিয়েছে।
ক্যাটালিস্ট কেয়ার লিমিটেডকে ৯২ হাজার পাউন্ড জরিমানা করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি কেন্টে তিনটি অনিবন্ধিত শিশু কেয়ার হোম পরিচালনা করেছিল। অফস্টেডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ১.৭ মিলিয়ন পাউন্ডের বেশি পেয়েছিল।
ডারহামের একটি অবৈধ কেয়ার হোমে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরীকে দুই সাবেক সেনাসদস্য নির্যাতন করেছিলেন বলেও তদন্তে উঠে এসেছে। ওই দুই ব্যক্তির অপরাধমূলক রেকর্ড ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে, কিছু প্রতিষ্ঠান কেয়ার বিধিমালার ২৮ দিনের ছুটির নিয়ম ব্যবহার করে শিশুদের দীর্ঘ সময় অনিবন্ধিত স্থাপনায় রাখছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নিয়ম অনুযায়ী, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কেয়ার ব্যবস্থায় থাকা শিশুরা ২৮ দিন পর্যন্ত অনিবন্ধিত কোনো স্থানে ছুটি কাটাতে পারে।
দ্য গার্ডিয়ান অন্তত ১১টি প্রতিষ্ঠান শনাক্ত করেছে, যারা এ ধরনের ২৮ দিনের সেবা দিচ্ছে। এর মধ্যে ছয়টি প্রতিষ্ঠান দেশের সবচেয়ে বেশি অনিবন্ধিত প্লেসমেন্ট পরিচালনাকারীদের মধ্যে রয়েছে।
অবৈধ প্লেসমেন্টের খরচের একটি বড় উদাহরণ থারক কাউন্সিলের ঘটনা। দুই শিশুকে দুই বছর ধরে একটি অবৈধ প্লেসমেন্টে রাখার জন্য কাউন্সিলটি ডিএমসি কনসালটিং সার্ভিসেসকে ২.৭ মিলিয়ন পাউন্ড দিয়েছে।
কাউন্সিল জানিয়েছে, অনিবন্ধিত কেয়ার ব্যবস্থার মান যাচাই করতে তারা কঠোর পরীক্ষা চালিয়েছে এবং নিয়মিত এসব স্থাপনা পরিদর্শন করেছে।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, মার্সিসাইডভিত্তিক সেইফস্পেস৪ইউ নামে একটি অনিবন্ধিত শিশু কেয়ার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ অপরাধের সঙ্গে যোগসূত্রের অভিযোগ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অবৈধভাবে কেয়ার হোম পরিচালনার অভিযোগে অফস্টেডের ফৌজদারি তদন্ত চলছে।
দ্য গার্ডিয়ান ও টিবিআইজের তদন্তে উঠে আসা তথ্যের পরিপ্রেক্ষিতে ইংল্যান্ডে নিবন্ধিত শিশু কেয়ার হোমের ঘাটতি, অনিবন্ধিত স্থাপনার ব্যবহার, সরকারি অর্থের ব্যয় এবং শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন সামনে এসেছে।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান
এম.কে
গত বছর যুক্তরাজ্যে প্রায় ৩৩০ মিলিয়ন পাউন্ড কর দেওয়া হেজ ফান্ড ব্যবসায়ী ক্রিস রোকোস যুক্তরাজ্য ছেড়ে গ্রিসে যাওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন। রোকোস ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টের প্রতিষ্ঠাতা এই ধনকুবের তার কর-বাসস্থান গ্রিসে স্থানান্তর করছেন এবং দেশটির রাজধানী এথেন্সে একটি অফিস খোলার পরিকল্পনা করেছেন বলে জানিয়েছে এলবিসি।
রোকোসের আনুমানিক সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৩ বিলিয়ন পাউন্ড। তিনি যুক্তরাজ্যের তৃতীয় সর্বোচ্চ করদাতা হিসেবে পরিচিত। গত বছর তার দেওয়া প্রায় ৩৩০ মিলিয়ন পাউন্ড করের পরিমাণ ১৫ হাজার সদ্য যোগ দেওয়া সামাজিক সেবা কর্মীর অর্থনৈতিক অবদানের সমপরিমাণ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে এলবিসি জানিয়েছে, রোকোস যুক্তরাজ্য থেকে সরে গিয়ে ইউরোপে নিজের অবস্থান তৈরি করছেন। তার প্রতিষ্ঠিত রোকোস ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টের প্রায় ২২ বিলিয়ন ডলারের ম্যাক্রো হেজ ফান্ড রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোকোসের যুক্তরাজ্য ছাড়ার সম্ভাব্য কারণগুলোর মধ্যে নন-ডমিসাইল করব্যবস্থা, উত্তরাধিকার কর এবং বেসরকারি স্কুলের ফি নিয়ে উদ্বেগের বিষয়গুলো রয়েছে।
রোকোস গত বছর নিজের প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ৪৭৭ মিলিয়ন পাউন্ড অর্থ নিয়েছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে তার হেজ ফান্ড বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতার মধ্যেও ভালো পারফরম্যান্স করেছে।
চলতি বছর রোকোস কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়কে ১৯০ মিলিয়ন পাউন্ড অনুদান দেওয়ার ঘোষণা দেন। বিশ্ববিদ্যালয়টির জন্য এটি বড় অঙ্কের অনুদান হিসেবে আলোচিত হয়েছে।
এদিকে, লেবার সরকারের সময়ে যুক্তরাজ্য থেকে ধনী ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের বিদেশে চলে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। রোকোসের আগে শিপিং ব্যবসায়ী জন ফ্রেডরিকসেন এবং ইস্পাত ব্যবসায়ী লক্ষ্মী মিত্তালসহ আরও কয়েকজন ধনী ব্যক্তির যুক্তরাজ্যের বাইরে যাওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে।
তবে যুক্তরাজ্য থেকে বিপুলসংখ্যক কোটিপতি চলে যাচ্ছেন—এমন দাবির পরিসংখ্যান নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। হেনলি প্রাইভেট ওয়েলথ মাইগ্রেশন আগে বড় ধরনের ‘ওয়েলথ ফ্লাইট’-এর কথা বললেও পরে তাদের পূর্ববর্তী মূল্যায়ন সংশোধন করে পরিস্থিতিকে ‘মডেস্ট’ বা সীমিত হিসেবে উল্লেখ করেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, হেনলির আগের গবেষণায় বিশ্বজুড়ে ১ লাখ ৪২ হাজার কোটিপতি দেশ পরিবর্তন করেছেন বলে দাবি করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ওই প্রতিবেদনের তথ্য সংগ্রহ ও পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। প্রতিষ্ঠানটি পরে জানায়, তথ্য পর্যাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত তারা দেশ পরিবর্তনকারী ধনী ব্যক্তিদের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা প্রকাশ করবে না।
অন্যদিকে, প্যাট্রিয়টিক মিলিয়নিয়ার্স ইউকে নামে পরিচিত ব্রিটিশ ধনীদের একটি সংগঠন জানিয়েছে, তারা আরও বেশি কর দিতে প্রস্তুত এবং যুক্তরাজ্যেই থাকার পরিকল্পনা করছে।
রোকোসের গ্রিসে যাওয়ার সিদ্ধান্ত এমন সময়ে সামনে এলো, যখন যুক্তরাজ্যে ধনী ব্যক্তিদের করব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে আলোচনা চলছে এবং আগামী বাজেটকে সামনে রেখে উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তিদের ওপর করের প্রভাব নিয়েও বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।
সূত্রঃ এল বি সি
এম.কে
ইসরাইলের এক সাবেক সেনাসদস্যকে বিজ্ঞাপনে তুলে ধরাকে কেন্দ্র করে তীব্র সমালোচনা ও বয়কটের আহ্বানের মুখে ক্ষমা চেয়েছে জার্মান ক্রীড়াসামগ্রী প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাডিডাস। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, বিতর্কিত বিজ্ঞাপনটি ছিল ইসরাইলে পরিচালিত স্থানীয় একটি প্রচারণার অংশ, কোনো বৈশ্বিক প্রচারণার অংশ নয়।
অ্যাডিডাসের ‘সিঙ্গেল শু’ পরিষেবার প্রচারের জন্য তৈরি বিজ্ঞাপনে দেখানো হয় শালেভ বিটনকে। ২০২১ সালে ইসরাইলি সেনাবাহিনীতে কর্মরত অবস্থায় আহত হওয়ার পর তার বাম পা কেটে ফেলতে হয়।
সোমবার দেওয়া এক বিবৃতিতে অ্যাডিডাস স্বীকার করে, স্থানীয়ভাবে পরিচালিত প্রচারণায় ব্যবহৃত একটি ছবি উদ্বেগ ও তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, কাউকে আঘাত করা তাদের উদ্দেশ্য ছিল না এবং এ ঘটনায় যারা ক্ষতিগ্রস্ত বা আহত বোধ করেছেন, তাদের কাছে তারা ক্ষমাপ্রার্থী।
ইসরাইলে অ্যাডিডাসের বিভিন্ন দোকানে প্রদর্শিত পোস্টারে মোট ১১ জন প্রতিবন্ধী ক্রীড়াবিদকে তুলে ধরা হয়েছিল। তাদের মধ্যে ছিলেন বিটনও। তবে ফিলিস্তিনপন্থী কর্মীরা বিশেষ করে সাবেক এক ইসরাইলি সেনাকে এই প্রচারণায় অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করেন।
সমালোচকদের মূল বক্তব্য, অঙ্গহানির শিকার মানুষদের অন্তর্ভুক্তি ও সহায়তার বার্তা নিয়ে যখন প্রচারণাটি পরিচালিত হচ্ছে, তখন গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযানের কারণে বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনি অঙ্গ হারানোর বাস্তবতার মধ্যে একজন সাবেক ইসরাইলি সেনাকে বিজ্ঞাপনে সামনে আনা অত্যন্ত সংবেদনশীল সিদ্ধান্ত।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মে মাসের এক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ৫ হাজারের বেশি আঘাতজনিত অঙ্গচ্ছেদের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। একই সময়ে ২২ হাজারের বেশি গুরুতর অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আঘাতের ঘটনাও নথিভুক্ত করা হয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, জীবন পরিবর্তনকারী এসব আঘাতের শিকারদের এক-চতুর্থাংশ পর্যন্ত শিশু হতে পারে।
অ্যাডিডাসের ওই প্রচারণার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো ব্যক্তিদের মধ্যে স্প্যানিশ অভিনেতা হাভিয়ের বারদেমও ছিলেন। তিনি ভোক্তাদের প্রতিষ্ঠানটি বয়কট করার আহ্বান জানান।
তবে অ্যাডিডাসের দাবি, ‘সিঙ্গেল শু’ পরিষেবাটির মূল উদ্দেশ্য ছিল অঙ্গগত ভিন্নতা থাকা ব্যক্তিদের জন্য জুতা কেনাকে আরও সহজ করা। যাদের দুই পায়ের জন্য একই ধরনের জুতার প্রয়োজন নেই, তারা যেন শুধু প্রয়োজনীয় একটি জুতো কিনতে পারেন—এই ধারণা থেকেই পরিষেবাটি চালু করা হয়েছে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে ইউরোপের ২৩টি দেশে পরিষেবাটি চালু করে অ্যাডিডাস। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব দোকান ও আউটলেট থেকে এক জোড়া জুতার দামের ৫০ শতাংশ মূল্যে একটি জুতো কেনার সুযোগ রাখা হয়। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিভিন্ন সংগঠন ও প্যারালিম্পিকসজিবিসহ সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর সঙ্গে পরামর্শ করেই কর্মসূচিটি তৈরি করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
অ্যাডিডাস আরও জানিয়েছে, ‘সিঙ্গেল শু’ কর্মসূচি ইউরোপের বাইরে এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যেও সম্প্রসারিত হচ্ছে। এর আওতায় ফিলিস্তিন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, লেবানন, সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার ও মিসরও রয়েছে।
ফলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক সেবা হিসেবে শুরু হওয়া অ্যাডিডাসের এই উদ্যোগ এখন গাজা যুদ্ধের রাজনৈতিক ও মানবিক বাস্তবতার সঙ্গে জড়িয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিজ্ঞাপন প্রত্যাহার ও ক্ষমা চাওয়ার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেও বয়কটের আহ্বান ও সমালোচনা এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
সূত্রঃ আনাদোলু এজেন্সি, টাইমস অব ইসরাইল
এম.কে
ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বন্ধ এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা টিকিয়ে রাখতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার পথে এগোচ্ছে যুক্তরাজ্য। এ অবস্থানের অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে উঠেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড। দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র দুই মাসের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল এবং ব্রিটিশ রক্ষণশীল মহলের চাপের মুখে নিজের অবস্থানে অনড় থাকায় তাকে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম দৃঢ়চেতা ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ব্রিটিশ সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, মঙ্গলবার ইসরাইলি অবৈধ বসতি থেকে পণ্য আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার পরিকল্পনা রয়েছে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের ২০২৪ সালের জুলাইয়ের পরামর্শমূলক রায়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য আনতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। ওই রায়ে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলের দখলদারিত্বকে অবৈধ হিসেবে উল্লেখ করা হয় এবং দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিভিন্ন রাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছিল।
মিলিব্যান্ডের পরিকল্পনা প্রকাশ্যে আসার পরই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। ইসরাইলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্রিটিশ সরকারের সমালোচনা করে ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগ তুলেছেন। তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, মিলিব্যান্ড নিজেও ইহুদি। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও ব্রিটেনের বর্তমান নীতির সমালোচনা করে দেশটিকে ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব ব্রিটেন’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সা’রও সতর্ক করে বলেছেন, ব্রিটেন ইসরাইলের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিলে ইসরাইলও ব্রিটেনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে।
এদিকে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্কিত এই উত্তেজনার মধ্যে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের মালিকানা নিয়েও নতুন করে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। নেতানিয়াহুর ছেলে ইয়ার নেতানিয়াহু ফকল্যান্ড নিয়ে ব্রিটেনের বিরোধিতা করে আর্জেন্টিনার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ইঙ্গিত দিয়েছেন, আর্জেন্টিনা ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জে হামলা চালালে যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটেনকে সমর্থন নাও করতে পারে।
মিলিব্যান্ডের পরিকল্পনার বিরোধিতা করছে ব্রিটিশ রক্ষণশীল বিরোধী দল ও দেশটির ডানপন্থী সংবাদমাধ্যমের একটি অংশও। ছায়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী টম টুগেনহাট ইসরাইলের অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানিয়ে দাবি করেছেন, ইসরাইলি বসতি থেকে পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা ব্রিটেনের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ‘কনজারভেটিভ ফ্রেন্ডস অব ইসরাইল’ও এই পরিকল্পনাকে নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য এবং ইসরাইলকে এককভাবে নিশানা করার পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
তবে এসব চাপ ও সমালোচনার মধ্যেও নিজের অবস্থান থেকে সরে আসার কোনো ইঙ্গিত দেননি মিলিব্যান্ড। পার্লামেন্টে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দেওয়া প্রথম বক্তব্যে তিনি বলেন, ফিলিস্তিন ও ইসরাইলের জন্য দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান ধ্বংস হতে দেওয়া হবে না। গাজার পরিস্থিতি নিয়েও তিনি আগের তুলনায় আরও কঠোর ভাষায় কথা বলেছেন। গাজায় থাকা মানুষের সঙ্গে বৈঠকের পর সেখানকার পরিস্থিতিকে ‘ভয়াবহ’ বলে বর্ণনা করে তিনি জানান, ব্রিটিশ সরকারকে আরও দৃঢ় ও দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।
ব্রিটিশ সরকারের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলোর দাবি, ইসরাইলি বসতি স্থাপনের বিরুদ্ধে প্রস্তাবিত পদক্ষেপের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি মিলিব্যান্ড নিজেই। তার আগের দুই লেবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি ও ইয়েভেট কুপার গাজার পরিস্থিতি নিয়ে কঠিন ব্রিফিং পেলেও মিলিব্যান্ডের মতো প্রকাশ্য ও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখাননি বলে সূত্রটি দাবি করেছে। একজন লেবার সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম ও মিলিব্যান্ড ইসরাইল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে ব্রিটিশ সরকারের নীতিতে ‘ব্যাপক পরিবর্তন’ আনার বিষয়টি সামনে আনতে যাচ্ছেন।
ফিলিস্তিনপন্থী সংগঠনগুলোর দীর্ঘদিনের অন্যতম দাবি হলো ইসরাইলি বসতি থেকে পণ্য আমদানির ওপর পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞা। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, কার্যকরভাবে এই নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করতে হলে শুধু পণ্য আমদানি বন্ধ করলেই হবে না; বসতিগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সেবা, ব্যবসায়িক কার্যক্রম এবং বিনিয়োগও নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন হবে শক্তিশালী আইনগত কাঠামো।
ইউরোপের কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে ইসরাইলি বসতিগুলোর বিরুদ্ধে একই ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে। আয়ারল্যান্ড, স্পেন ও বেলজিয়াসহ কয়েকটি দেশ বসতি স্থাপনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। তবে ব্রিটিশ সরকারি সূত্রগুলোর দাবি, যুক্তরাজ্যের পরিকল্পিত নিষেধাজ্ঞা এসব উদ্যোগের তুলনায় আরও কঠোর হতে পারে।
ইসরাইলের নতুন ‘ই১’ বসতি প্রকল্প নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। পূর্ব জেরুজালেমের কাছে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে অধিকৃত পশ্চিম তীর কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যেতে পারে। এতে ভবিষ্যতে ভৌগোলিকভাবে সংযুক্ত ও কার্যকর একটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণেই ইসরাইলি বসতি সম্প্রসারণ বন্ধের প্রশ্নটি এখন আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।
মিলিব্যান্ডের অবস্থান নিয়ে ইসরাইলপন্থী সমালোচকেরা প্রায়ই অভিযোগ করেন, ব্রিটেনের মুসলিম জনগোষ্ঠীর চাপের কারণেই তিনি ফিলিস্তিনের প্রতি কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা জনমত জরিপগুলো এ দাবির পক্ষে শক্ত প্রমাণ দেয় না। একটি জরিপ অনুযায়ী, মাত্র ১৬ শতাংশ ব্রিটিশ নাগরিক ইসরাইলি বসতি থেকে পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করেন। লেবার পার্টির ১৪০ জনের বেশি এমপিও বসতিগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যে পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞার আহ্বান জানিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
চলতি বছরের শুরুতে লেবার সদস্যদের মধ্যে পরিচালিত একটি জরিপে ৮৭ শতাংশ নিষেধাজ্ঞার পক্ষে মত দিয়েছেন। ফলে মিলিব্যান্ডের অবস্থান শুধু লেবার পার্টির একটি অংশের দাবি নয়, ব্রিটিশ জনমতের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের সঙ্গেও তার অবস্থানের মিল রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
ইসরাইল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে মিলিব্যান্ডের বর্তমান অবস্থান অবশ্য নতুন নয়। ২০১৪ সালে লেবার নেতা থাকাকালে গাজায় ইসরাইলি সামরিক অভিযানে বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার পর তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের নীতির কঠোর সমালোচনা করেছিলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের ইসরাইলি সামরিক অভিযানের বিষয়ে ‘নীরবতা’র সমালোচনা করে তিনি ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের হত্যার ঘটনায় সরকারের অবস্থানকে ভুল বলে মন্তব্য করেন। একই বছর তিনি একতরফাভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার পক্ষেও অবস্থান নেন।
গত বছরও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারকে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগকারী মন্ত্রীদের মধ্যে মিলিব্যান্ড অন্যতম ছিলেন বলে সরকারি সূত্রের দাবি। ফলে তার বর্তমান অবস্থানকে হঠাৎ করে নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত হিসেবে না দেখে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবস্থানের ধারাবাহিকতা হিসেবেই দেখছেন অনেকে।
মিলিব্যান্ডের সাম্প্রতিক উদ্যোগ তাই শুধু ইসরাইলি বসতি থেকে পণ্য আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এটি ব্রিটিশ পররাষ্ট্রনীতির বৃহত্তর পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে কি না, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। রক্ষণশীল সরকারের সময়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের ইসরাইলবিষয়ক বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্রিটেনের অবস্থান সমালোচিত হয়েছিল। স্টারমার সরকারের আমলে ইসরাইলের বিরুদ্ধে কিছু সীমিত পদক্ষেপ নেওয়া হলেও পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞার পথে যায়নি ব্রিটেন।
অস্ত্র রপ্তানিতে সীমিত নিষেধাজ্ঞা এবং গাজা নিয়ে বিভিন্ন পদক্ষেপের পর এবার ইসরাইলি বসতি থেকে পণ্য আমদানিতে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে তা ব্রিটিশ নীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্রিটেনের ঐতিহ্যগত ঘনিষ্ঠ পররাষ্ট্রনৈতিক সম্পর্কও নতুন পরীক্ষার মুখে পড়তে পারে।
সূত্রঃ মিডল ইস্ট আই
এম.কে
ইতালির ভেনিসে চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিতে গিয়ে অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন শারীরিক ও মানসিকভাবে হেনস্তার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে ইতালি শাখা বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কয়েকজন কর্মী। মেস্ত্রে শহরের একটি পার্কে রাতে হাঁটার সময় তাকে ঘিরে ধরে ‘জুলাই জঙ্গি’ বলে সম্বোধন, গায়ে হাত তোলা এবং জোর করে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে বলে বাঁধন অভিযোগ করেছেন।
ঘটনার পর নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া ভিডিওবার্তায় বাঁধন বিস্তারিত বর্ণনা দেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি ভেনিসে চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিতে অবস্থান করছেন। রাতে মেস্ত্রের একটি এলাকায় হাঁটার সময় কয়েকজন বাংলাদেশি তাকে ঘিরে ধরেন এবং একপর্যায়ে তার সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ ও শারীরিকভাবে হেনস্তা করা হয়।
বাঁধনের অভিযোগ, ওই ব্যক্তিরা তাকে ‘জুলাই জঙ্গি’ বলে আখ্যায়িত করেন। একই সঙ্গে তাকে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে চাপ দেওয়া হয়। তবে তিনি নিজেকে একজন গর্বিত ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
ঘটনার সময়কার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে বলে বিভিন্ন পোস্টে দাবি করা হয়েছে। এসব ভিডিও ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টের ভিত্তিতে কয়েকজনকে ঘটনায় জড়িত বা অভিযুক্ত হিসেবে শনাক্ত করার দাবি উঠেছে। তাদের মধ্যে মাদারীপুর জেলার মনিরুল হাওলাদার, যাকে কোথাও কোথাও হাওলাদার মনিরুল নামেও উল্লেখ করা হয়েছে, তার নাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসেছে।
বাঁধন তার বক্তব্যে বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় এবং পরবর্তী সময়ে তার রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নানা ধরনের সমালোচনা ও বিরোধিতা হয়েছে। তিনি নিজেকে গর্বিত জুলাই যোদ্ধা হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, জুলাই ২০২৪-এর পরও তিনি পেশাগত ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কাজ বাছাই করেননি।
বাঁধনের দাবি, আওয়ামী লীগের সাবেক এক মন্ত্রীর ছেলের পরিচালনায় নির্মিত চলচ্চিত্রেও তিনি জুলাই ২০২৪-এর পর কাজ করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও একজন শিল্পী হিসেবে পেশাগত কাজের ক্ষেত্রে তিনি ব্যক্তিগত বিদ্বেষকে প্রাধান্য দেননি।
ঘটনার পর ক্ষোভ প্রকাশ করে বাঁধন বলেন, এ ধরনের আচরণ প্রমাণ করে যে নারীরা ছাত্রলীগের হাতে নিরাপদ নয়। তার মতে, ইতালির মতো বিদেশের মাটিতে একজন নারী শিল্পীকে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে হেনস্তার অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর বিষয়।

বাঁধন আরও বলেন, ঘটনার ভিডিও পুরো বিশ্ব দেখবে এবং এর মাধ্যমে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও তাদের অঙ্গসংগঠনগুলোর আচরণ সম্পর্কে আন্তর্জাতিক মহল ধারণা পাবে। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছিল, তার পেছনে কী ধরনের পরিস্থিতি ও জনঅসন্তোষ কাজ করেছিল—এই ঘটনাও সেই প্রশ্নকে সামনে আনবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আজমেরী হক বাঁধন বর্তমানে ইতালিতে চলচ্চিত্র উৎসবকে কেন্দ্র করে অবস্থান করছেন। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করা একজন অভিনেত্রীর সঙ্গে বিদেশের মাটিতে রাজনৈতিক বিরোধকে কেন্দ্র করে এমন অভিযোগ ওঠায় ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এ ঘটনায় ইতালির পুলিশের কাছে কোনো অভিযোগ বা মামলা হয়েছে কি না, কিংবা তদন্ত শুরু হয়েছে কি না—সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ সত্যতা ও জড়িত ব্যক্তিদের ভূমিকা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিদেশের মাটিতে একজন বাংলাদেশি অভিনেত্রীর সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধের জেরে কথিত শারীরিক ও মানসিক হেনস্তার এই অভিযোগ ইতোমধ্যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, প্রবাসী সংগঠনগুলোর কর্মকাণ্ড এবং নারীর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
সূত্রঃ বাংলা ট্রিবিউন ও কালবেলার প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং আজমেরী হক বাঁধনের ভেরিফায়েড ফেসবুক ভিডিওবার্তা
এম.কে
কলকাতার খ্যাতিমান অভিনেতা বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী বাংলাদেশে এসে গরুর মাংস খাওয়ার কথা প্রকাশ্যে বলার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্কের মুখে পড়েছেন। তার এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু ধর্মাবলম্বী নেটিজেনদের একটি অংশের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
বাংলাদেশে নিয়মিত যাতায়াত করেন বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী। এ দেশের পরিবেশ ও সংস্কৃতির পাশাপাশি স্থানীয় খাবারের প্রতিও তার আগ্রহ রয়েছে। সংবাদকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে বাংলাদেশের পছন্দের খাবার সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি ইলিশ মাছ ও গরুর মাংসের প্রতি নিজের ভালো লাগার কথা জানান।
বিশেষ করে বাংলাদেশে এসে তৃপ্তি সহকারে গরুর মাংস খাওয়ার কথা উল্লেখ করে অভিনেতা জানান, সেদিন বিকালেও তিনি গরুর মাংস খাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের গরুর মাংসের স্বাদই আলাদা।
এই বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পরই বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়। ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম নেওয়া একজন শিল্পী হিসেবে তার এমন খাদ্যাভ্যাস ও প্রকাশ্য মন্তব্যকে ধর্মীয় রীতিনীতি ও সামাজিক প্রত্যাশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন নেটিজেনদের একটি অংশ।
সমালোচকদের কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশ্বজিৎ চক্রবর্তীর অভিনীত সিনেমা ও নাটক বয়কটের আহ্বান জানিয়েছেন। এমনকি কলকাতার কিছু মানুষ তাকে নিজ রাজ্য বা দেশে প্রবেশ করতে না দেওয়ার হুমকিও দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তাদের কেউ কেউ তাকে বাংলাদেশেই স্থায়ীভাবে থাকার কথাও বলেছেন।
তবে এই সমালোচনার বিপরীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরেকটি পক্ষ বিশ্বজিতের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তাদের বক্তব্য, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ কী খাবেন, সেটি তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। তার খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে অন্য কারও ধর্মীয় বিশ্বাস বা ব্যক্তিগত পছন্দের সম্পর্ক থাকা উচিত নয়।
এই পক্ষের মতে, বিশ্বজিৎ কাউকে গরুর মাংস খাওয়ার জন্য উৎসাহিত করছেন না কিংবা নিজের খাদ্যাভ্যাস অন্যের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছেন না। ফলে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত খাদ্যপছন্দের কারণে একজন প্রতিষ্ঠিত শিল্পীকে আক্রমণ, অপমান কিংবা তার কাজ বয়কটের ডাক দেওয়া অযৌক্তিক।
বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী দীর্ঘদিন ধরে বাংলা চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন জগতের পরিচিত মুখ। অভিনয়জীবনে বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে কাজ করে তিনি দর্শকদের কাছে পরিচিতি পেয়েছেন। ফলে তার ব্যক্তিগত খাদ্যাভ্যাস নিয়ে তৈরি হওয়া এই বিতর্ককে কেন্দ্র করে শিল্পীর কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের সীমারেখা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো শিল্পীর ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের সঙ্গে তার পেশাগত যোগ্যতা বা শিল্পীসত্তাকে এক করে দেখা উচিত নয়। একই সঙ্গে ধর্মীয় অনুভূতির বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ায় এ ধরনের মন্তব্য নিয়ে সামাজিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হওয়াও অস্বাভাবিক নয়। তবে মতপার্থক্য বা সমালোচনার ক্ষেত্রেও ব্যক্তিগত আক্রমণ, হুমকি কিংবা সামাজিক বয়কটের আহ্বান পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করতে পারে।
সূত্রঃ ইন্ডিয়া হুড
এম.কে
এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) জুলাই-অগাস্ট মেয়াদের ১ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলারের আমদানি বিল পরিশোধের পরও বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩১ বিলিয়ন ডলারের ঘরে রয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম-৬ পদ্ধতির হিসাবে রোববার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩১ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলারে। আর মোট বা গ্রস হিসাবে রিজার্ভের পরিমাণ ৩৬ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার দিন শেষে বিপিএম-৬ হিসাবে বাংলাদেশের রিজার্ভ ছিল ৩২ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার এবং গ্রস হিসাবে ছিল ৩৭ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার। আকুর বিল পরিশোধের পর রিজার্ভ কমলেও তা এখনও ৩১ বিলিয়ন ডলারের ওপরে রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানান, জুলাই-অগাস্ট মেয়াদের আকুর ১ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলারের আমদানি বিল পরিশোধের পর সমন্বয় শেষে যে রিজার্ভ রয়েছে, তা দিয়ে প্রায় সাড়ে চার মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব।
এর আগে গত ৭ জুলাই মে-জুন মেয়াদের আকুর ১ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারের আমদানি বিল পরিশোধ করা হয়েছিল। ওই সময় বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ কমে ৩১ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলারে এবং গ্রস হিসাবে ৩৬ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছিল।
তবে গত কয়েক মাসে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয়ের ইতিবাচক প্রবাহ এবং বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর বাজেট সহায়তার ঋণের কারণে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত আবারও শক্তিশালী অবস্থানে ফিরেছে।
গত ১৪ জুন এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ১০০ কোটি ডলারের বাজেট সহায়তা ঋণ যুক্ত হওয়ার পর বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ ৩১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে ৩১ দশমিক ০৭ বিলিয়ন ডলারে ওঠে। গ্রস হিসাবে তা দাঁড়ায় ৩৫ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার।
এরপর ২৯ জুন বিশ্বব্যাংকের ৬৬ কোটি ৭১ লাখ ডলারের বাজেট সহায়তা ঋণ যোগ হলে বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ বেড়ে ৩২ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। সেদিন গ্রস রিজার্ভ ছিল ৩৭ দশমিক ০৫ বিলিয়ন ডলার।
রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় বাড়ার প্রভাবে ২ জুলাই বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ আরও বেড়ে ৩৩ দশমিক ০১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। গ্রস হিসাবে রিজার্ভ ছিল ৩৭ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার।
আকু হচ্ছে এশিয়ার কয়েকটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যে আন্তঃআঞ্চলিক লেনদেন নিষ্পত্তির একটি ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে আমদানি-রপ্তানি লেনদেনের মূল্য সাধারণত প্রতি দুই মাস পরপর নিষ্পত্তি করা হয়। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, ইরান, নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার, ভুটান ও মালদ্বীপ এ ব্যবস্থার সদস্য।
বাংলাদেশ ব্যাংক বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে হিসাব করা রিজার্ভকে তাৎক্ষণিক ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ হিসেবে বিবেচনা করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে পণ্য আমদানিতে বাংলাদেশের ব্যয় হয়েছে ৭ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলার। সেই হিসাবে বর্তমান ৩১ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলারের তাৎক্ষণিক ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ দিয়ে প্রায় সাড়ে চার মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব।
আন্তর্জাতিকভাবে একটি দেশের অন্তত তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার মজুত থাকা প্রয়োজন বলে বিবেচনা করা হয়। সেই বিচারে বাংলাদেশের বর্তমান রিজার্ভ পরিস্থিতি আপাতত ওই ন্যূনতম সীমার ওপরে রয়েছে।
একসময় বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দ্রুত বাড়ছিল। ২০২১ সালের অগাস্টে দেশের রিজার্ভ প্রথমবারের মতো ৪৮ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করে। তখন বিপুল রিজার্ভ কীভাবে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়, সেটিও নীতিনির্ধারকদের জন্য আলোচনার বিষয় ছিল।
কিন্তু ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি, খাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়ে যায়। এতে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে থাকে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ তৈরি হয়। ধারাবাহিক পতনের একপর্যায়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে রিজার্ভ ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছিল।
রিজার্ভের পতন ঠেকাতে তৎকালীন সরকার আইএমএফের কাছ থেকে ঋণ নেয়। আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী ২০২৩ সাল থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক গ্রস রিজার্ভের পাশাপাশি আইএমএফ অনুসৃত বিপিএম-৬ পদ্ধতিতেও রিজার্ভের হিসাব প্রকাশ শুরু করে। বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিট বা প্রকৃত রিজার্ভের হিসাবও করে, যদিও সেটি নিয়মিত প্রকাশ করা হয় না।
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের প্রধান দুই উৎস হলো রপ্তানি আয় ও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রপ্তানি আয় দশমিক ২৫ শতাংশ কমলেও রেমিট্যান্স বেড়েছিল ১৭ দশমিক ৩৪ শতাংশ।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাস জুলাই ও অগাস্টেও রেমিট্যান্স প্রবাহে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। এ সময়ে রেমিট্যান্স বেড়েছে প্রায় ১৯ শতাংশ। একই সময়ে রপ্তানি আয় বেড়েছে ৫ দশমিক ৪৩ শতাংশ।
ফলে আকুর বড় অঙ্কের আমদানি বিল পরিশোধের পর রিজার্ভ কিছুটা কমলেও রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয়ের ইতিবাচক প্রবাহ এবং বৈদেশিক সহায়তার কারণে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বর্তমানে ৩১ বিলিয়ন ডলারের ওপরে রয়েছে। অর্থনীতির বিভিন্ন চাপের মধ্যেও রিজার্ভের এই অবস্থানকে আপাতত স্বস্তিদায়ক সূচক হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
সূত্রঃ বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন
এম.কে
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের শহীদ ডা. ফজলে রাব্বি হলের করিডরে গত ২ সেপ্টেম্বর মুহূর্তটি হয়ে উঠেছিল আবেগঘন। দীর্ঘ তিন দশকের অপেক্ষার পর মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ জানতে পারেন, তিনি চূড়ান্ত এমবিবিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। ৫২ বছর বয়সে নামের পাশে ‘ডা.’ যুক্ত করার এই সাফল্য শুধু একটি শিক্ষাগত অর্জন নয়; দীর্ঘ প্রতিকূলতা, ব্যক্তিগত শোক ও শিক্ষাজীবনের নানা বাধা পেরিয়ে স্বপ্ন পূরণের এক বিরল দৃষ্টান্ত।
হাবিবুল্লাহ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ১৯৯৫-৯৬ শিক্ষাবর্ষের কে-৫৩ ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। স্বাভাবিকভাবে তার এমবিবিএস শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০০১ সালে। কিন্তু নানা ঘটনার কারণে সেই শিক্ষাজীবন থেমে যায়। প্রায় দুই দশক পড়াশোনা থেকে দূরে থাকার পর ২০২২ সালে তিনি আবার নিজের পুরোনো স্বপ্ন পূরণের সিদ্ধান্ত নেন। শেষ পর্যন্ত ২০২৬ সালে এসে তিনি এমবিবিএস সম্পন্ন করেন।
হাবিবুল্লাহর জন্ম ১৯৭৪ সালে কিশোরগঞ্জের রহিমপুরে। তার বাবা ডা. আবু বকর মোহাম্মদ সিদ্দিক ছিলেন কিশোরগঞ্জের প্রথম এমবিবিএস চিকিৎসক। বাবার চাকরির সুবাদে কিশোরগঞ্জের পাশাপাশি কক্সবাজার ও রাঙামাটিতেও তার শৈশব কেটেছে। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী ও শান্ত স্বভাবের। প্রকৃতি, নদী, সমুদ্র ও সবুজ পরিবেশ তার জীবনে বিশেষ প্রভাব ফেলেছিল।
১৯৯২ সালে রামানন্দ হাই স্কুল, বর্তমানে কিশোরগঞ্জ সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়, থেকে এসএসসি পরীক্ষায় বৃহত্তর ময়মনসিংহে প্রথম হয়ে রায় সাহেব মেমোরিয়াল গোল্ডেন অ্যাওয়ার্ড পান হাবিবুল্লাহ। এরপর তিনি ঢাকার নটর ডেম কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু আবাসনসংকট, খাওয়াদাওয়ার সমস্যা ও প্রচণ্ড মানসিক চাপের কারণে মাত্র তিন মাস পর তাকে কলেজ ছাড়তে হয়। পরে কিশোরগঞ্জের গুরুদয়াল কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন।
শিক্ষাজীবনে পরীক্ষাভীতিও তার জন্য বড় বাধা ছিল। পরীক্ষার প্রায় এক মাস আগে থেকেই তীব্র পরীক্ষাভীতি দেখা দিত। এতে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়তেন এবং প্রায় সব পরীক্ষাই অসুস্থ অবস্থায় দিতে হয়েছিল।
১৯৯৫-৯৬ সালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই মনোরোগবিদ্যার প্রতি তার গভীর আগ্রহ তৈরি হয়। তৎকালীন মানসিক রোগ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক এ এস মোহাম্মদ ফিরোজের অধীনে সাইকিয়াট্রিতে তার আগ্রহ আরও গভীর হয়। ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশের প্রথম মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক সচেতনতামূলক পত্রিকা ‘মনোজগৎ’-এর সঙ্গেও যুক্ত হন তিনি।
তবে ১৯৯৮ সালের শেষ দিকে একটি মানবিক উদ্যোগ তার জীবনের গতিপথ বদলে দেয়। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের অসুস্থ সহযোগী অধ্যাপক ডা. আব্দুল মোমেন তালুকদারের চিকিৎসার জন্য তহবিল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন হাবিবুল্লাহ। বিভিন্ন বিভাগের প্রধানদের কাছ থেকে স্বাক্ষর সংগ্রহ করে তিনি উদ্যোগটি এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন।
এই উদ্যোগের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বৈঠককে কেন্দ্র করে তার সঙ্গে শিক্ষকদের বিরোধ তৈরি হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে তিনি একাধিকবার পরীক্ষায় অকৃতকার্য হন। এমনকি তৎকালীন অধ্যক্ষ তাকে বলেছিলেন, ‘তুমি ৫০০ বছরেও এমবিবিএস পাস করতে পারবে না।’ হাবিবুল্লাহর বর্ণনা অনুযায়ী, ওই সময়ের মানসিক চাপ ও ধারাবাহিকভাবে পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়ার কারণে শেষ পর্যন্ত তিনি পড়াশোনা থেকে দূরে সরে যেতে বাধ্য হন।
এরপর তার জীবনে নেমে আসে দীর্ঘ অন্ধকার সময়। ২০০০ সালে তিনি বাবাকে হারান। এর প্রায় দুই বছর পর স্ত্রীকেও হারান। ব্যক্তিগত শোক, শিক্ষাজীবনের অনিশ্চয়তা এবং দীর্ঘদিনের ব্যর্থতার বেদনা তাকে গভীরভাবে আঘাত করে। যে মানুষটি নিজে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন, তাকেই দীর্ঘ সময় নিজের মানসিক লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
জীবন চালিয়ে নিতে কিশোরগঞ্জে একটি কোচিং সেন্টার পরিচালনা করেন তিনি। কিন্তু চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন কখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। নিজের মধ্যে চিকিৎসক হওয়ার আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে না পারার গ্লানি দীর্ঘদিন তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। সেই সময়ে তার বড় ভাই লুৎফুর রহমান সিদ্দিকী তাকে বারবার নতুন করে জীবন শুরু করার সাহস জুগিয়েছেন।
শেষ পর্যন্ত ২০২২ সালে সিদ্ধান্ত নেন, বয়স যতই হোক, অসমাপ্ত চিকিৎসাশিক্ষা শেষ করবেন। কিন্তু প্রায় ২৫ বছর আগের শিক্ষাজীবনের নথিপত্র খুঁজে পাওয়া ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের সিনিয়র অফিস সহকারী রফিকুল ইসলাম মামুন পুরোনো ফাইল খুঁজে বের করে তাকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহে সহায়তা করেন।
এরপর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের একাডেমিক কাউন্সিলের বিশেষ সভা বসে। ৭৮ সদস্যের কাউন্সিলের সামনে নিজের জীবনের ঘটনাগুলো তুলে ধরেন হাবিবুল্লাহ। তার বক্তব্য ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে কাউন্সিল তাকে আবার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেয়। তবে তাকে প্রায় দুই লাখ টাকা জরিমানা দিতে হয় এবং এক বছর নিয়মিত ওয়ার্ডে কাজ করার শর্ত দেওয়া হয়।
২০২২ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৩ সালের নভেম্বর পর্যন্ত তিনি নিয়মিত ওয়ার্ড ক্লাস করেন। নিজের বয়সের তুলনায় প্রায় ২২ বছরের ছোট শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আবার শ্রেণিকক্ষে বসা এবং ওয়ার্ডে কাজ করা তার জন্য ছিল বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। কিন্তু বয়সকে বাধা হতে দেননি তিনি।
এরপর সার্জারি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে প্রথমবারেই উত্তীর্ণ হন। মাঝখানে আবার দুই বছরের বিরতি এলেও শেষ পর্যন্ত বাকি পরীক্ষাগুলোও সফলভাবে সম্পন্ন করেন। গত ২ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ৩০ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটে।
তার এই সাফল্যে শিক্ষক ও সহপাঠীদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে আবেগ ও প্রশংসা। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের সাবেক উপাধ্যক্ষ ও নিউনেটাল বিভাগের অধ্যাপক ডা. আবদুল হানিফ টাবলু বলেন, দীর্ঘ ২০ বছর পর পড়াশোনায় ফিরে আসায় হাবিবুল্লাহর মধ্যে শুরুতে অনিশ্চয়তা ছিল। তাকে বিশেষ ক্লাসের ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সব বাধা পেরিয়ে তার সফলভাবে উত্তীর্ণ হওয়াকে তিনি অত্যন্ত প্রশংসনীয় বলে উল্লেখ করেন।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের মানসিক রোগ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. রাজিবুর রহমানও হাবিবুল্লাহর সাফল্যকে অনন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, জীবনের কোনো পর্যায়েই নতুন করে শুরু করার সুযোগ শেষ হয়ে যায় না। কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও মানুষ চাইলে নিজের জীবনকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে পারে—হাবিবুল্লাহ তার বাস্তব উদাহরণ।
তবে এত বড় সাফল্যের দিনেও হাবিবুল্লাহর মনে রয়েছে গভীর আফসোস। সময়মতো পড়াশোনা শেষ করতে না পারায় তার মা অনেক কেঁদেছিলেন। আজ বাবা-মা দুজনই বেঁচে নেই। তাই তাদের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চিকিৎসক হয়ে ওঠার খবরটি জানাতে না পারার আক্ষেপ থেকেই গেছে তার মনে।
কয়েক দিনের মধ্যেই শুরু হবে তার এক বছরের ইন্টার্নশিপ। এরপর মনোরোগবিদ্যা নিয়ে গবেষণা করার ইচ্ছা রয়েছে ডা. হাবিবুল্লাহর। ৫২ বছর বয়সে এমবিবিএস পাসের মাধ্যমে তিনি শুধু নিজের বহু বছরের স্বপ্ন পূরণ করেননি, বরং প্রমাণ করেছেন—বয়স, ব্যর্থতা কিংবা দীর্ঘ বিরতিও ইচ্ছাশক্তি ও অধ্যবসায়ের কাছে শেষ পর্যন্ত বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।
সূত্রঃ কালের কণ্ঠ
এম.কে
যুক্তরাজ্যে ত্বকের ক্যানসারের অন্যতম গুরুতর ধরন মেলানোমায় আক্রান্তের সংখ্যা রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। নতুন বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দেশটিতে প্রথমবারের মতো বছরে মেলানোমা আক্রান্তের সংখ্যা ২০ হাজার ছাড়িয়েছে। ২০২২ সালে যুক্তরাজ্যে ২০ হাজার ৯৮০ জনের মেলানোমা শনাক্ত হয়েছিল।
এই পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত রোদ, অতিবেগুনি রশ্মি বা ইউভি রেডিয়েশন এবং কৃত্রিমভাবে ত্বক ট্যান করার প্রবণতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ৭ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত সম্পাদকীয়তে দ্য গার্ডিয়ান বলেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সূর্যের আলো থেকে সৃষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকিও আরও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
২০২৬ সালের ইউরোপের অস্বাভাবিক উষ্ণ ও শুষ্ক গ্রীষ্মে খোলা জায়গায় কাজ করা মানুষ এবং অবসর সময়ে রোদে থাকা ব্যক্তিরা ইউভি রশ্মির ঝুঁকির আরও বেশি মুখোমুখি হয়েছেন। একই সঙ্গে অতিরিক্ত গরম ও পানিশূন্যতার ঝুঁকিও বেড়েছে। দ্য গার্ডিয়ানের মতে, জলবায়ুর নতুন ঝুঁকির সঙ্গে স্বাস্থ্যঝুঁকির এই সম্পর্ককে জনস্বাস্থ্য নীতিতেও গুরুত্ব দিতে হবে।
ক্যানসার রিসার্চ ইউকে-এর বিশ্লেষণ বলছে, যুক্তরাজ্যে মেলানোমা আক্রান্তের সংখ্যা ২০৪০ সালের মধ্যে বছরে ২৬ হাজার ৫০০-তে পৌঁছাতে পারে। পুরুষদের ক্ষেত্রে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ২৩ শতাংশ এবং নারীদের ক্ষেত্রে ২৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও মানুষের গড় বয়স বাড়ার বিষয়টিও এই বৃদ্ধির পেছনে ভূমিকা রাখছে।
মেলানোমা যুক্তরাজ্যের পঞ্চম সর্বাধিক সাধারণ ক্যানসার। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ক্যানসার রিসার্চ ইউকে-এর হিসাবে দেশটির প্রায় ৯০ শতাংশ মেলানোমা আক্রান্তের সঙ্গে সূর্য ও সানবেড থেকে অতিরিক্ত ইউভি রশ্মির সংস্পর্শের সম্পর্ক রয়েছে। পাঁচবার বা তার বেশি রোদে ত্বক পুড়ে গেলে মেলানোমার ঝুঁকি দ্বিগুণ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ত্বকের ক্যানসারের বড় একটি অংশ প্রতিরোধযোগ্য। সূর্য তীব্র হলে ছায়ায় থাকা, শরীর ঢেকে রাখা, টুপি ও সানগ্লাস ব্যবহার এবং উচ্চমাত্রার সানস্ক্রিন ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ক্যানসার রিসার্চ ইউকে অন্তত এসপিএফ ৩০ সানস্ক্রিন ব্যবহারের এবং নিয়মিত তা পুনরায় লাগানোর পরামর্শ দিয়েছে।
শুধু তীব্র গরমের দিনেই যে ত্বক পুড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, তা নয়। তুলনামূলক ঠান্ডা বা মেঘলা দিনেও ইউভি রশ্মির কারণে ত্বকের ক্ষতি হতে পারে। তাই আবহাওয়া ঠান্ডা মনে হলেও দীর্ঘ সময় সরাসরি রোদে থাকার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
কৃত্রিমভাবে ত্বক ট্যান করার জন্য সানবেড ব্যবহারের বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। মে মাসে একদল ব্রিটিশ এমপি সানবেডের বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব দেন। এর আগে বিশেষজ্ঞরা বাণিজ্যিকভাবে সানবেডের ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার পক্ষে মত দিয়েছিলেন। অস্ট্রেলিয়া ও ব্রাজিলে এ ধরনের কঠোর ব্যবস্থা রয়েছে বলে দ্য গার্ডিয়ান উল্লেখ করেছে।
যুক্তরাজ্যের জাতীয় ক্যানসার পরিকল্পনাতেও সানবেড নিয়ে আরও প্রমাণ সংগ্রহের কথা রয়েছে। একই সময়ে তরুণদের মধ্যে ট্যানিংয়ের জনপ্রিয়তা বাড়ছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর প্রচার এই প্রবণতা বাড়াতে ভূমিকা রাখছে বলে দ্য গার্ডিয়ানের সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়ার দীর্ঘদিনের জনস্বাস্থ্য প্রচারণাকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ১৯৮১ সালে দেশটিতে ‘স্লিপ, স্লপ, স্ল্যাপ’ প্রচারণা শুরু হয়েছিল। এর মূল বার্তা ছিল জামা দিয়ে শরীর ঢেকে রাখা, সানস্ক্রিন ব্যবহার এবং মাথায় টুপি পরা। দেশটির স্কুলগুলোতে ‘নো হ্যাট, নো প্লে’ নীতিও চালু রয়েছে, অর্থাৎ টুপি ছাড়া রোদে খোলা জায়গায় খেলাধুলা করা যাবে না।
দ্য গার্ডিয়ানের মতে, যুক্তরাজ্যে সূর্যের আলো ও অতিরিক্ত তাপমাত্রা দীর্ঘদিন ধরে তুলনামূলকভাবে কম থাকায় মানুষের মধ্যে ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে। তবে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ক্রমেই বাড়তে থাকায় এই পুরোনো ধারণা বদলানোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
এদিকে ক্যানসারের চিকিৎসায় ইমিউনোথেরাপিসহ আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতিতে বড় অগ্রগতি হলেও শুধু উন্নত চিকিৎসার ওপর নির্ভর না করে রোগ প্রতিরোধ ও জনস্বাস্থ্য সচেতনতার ওপরও জোর দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশেষ করে মেলানোমার মতো ক্যানসারের ক্ষেত্রে মানুষের আচরণ পরিবর্তন করে ঝুঁকি কমানোর সুযোগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, ত্বকে নতুন বা পরিবর্তিত তিল, দীর্ঘদিন না শুকানো ক্ষত কিংবা অস্বাভাবিক কোনো দাগ দেখা গেলে দ্রুত জিপির সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত। মেলানোমা দ্রুত শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসার ফল অনেক ভালো হতে পারে।
রেকর্ড তাপমাত্রার এই গ্রীষ্মের পর দ্য গার্ডিয়ান মনে করছে, ২০২৭ সালের গ্রীষ্ম আসার আগেই সূর্যের আলো ও কৃত্রিম ইউভি রশ্মির ঝুঁকি নিয়ে যুক্তরাজ্যে আরও জোরালো জনসচেতনতামূলক প্রচারণা প্রয়োজন। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে সূর্যজনিত ত্বকের ক্যানসার প্রতিরোধও দেশটির জনস্বাস্থ্য নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান ও ক্যানসার রিসার্চ ইউকে
এম.কে
