Categories
যুক্তরাজ্য (UK)

চিকেন শপ-নেইল বারেও স্কিল্ড ওয়ার্কার ভিসাঃ ব্রিটেনের অভিবাসন ব্যবস্থায় বড় প্রশ্ন

ব্রিটেনের স্কিল্ড ওয়ার্কার ভিসা ব্যবস্থার বড় ধরনের দুর্বলতা ও সম্ভাব্য অপব্যবহারের চিত্র সামনে এসেছে। নতুন তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বিদেশি কর্মী নিয়োগের জন্য স্কিল্ড ওয়ার্কার ভিসা স্পনসর করার অনুমতি পাওয়া প্রতিষ্ঠানের তালিকায় ছিল চিকেন শপ, ভ্যাপের দোকান, গাড়ি ধোয়ার ব্যবসা, চুল ও সৌন্দর্যসেবা প্রতিষ্ঠান এবং নেইল বার।

তথ্যগুলো ফ্রিডম অব ইনফরমেশন বা তথ্য অধিকার আইনের মাধ্যমে সংগ্রহ করেছে রিফর্ম ইউকে। পরে এসব তথ্য দ্য টেলিগ্রাফকে দেওয়া হয়। সংবাদমাধ্যমটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, স্কিল্ড ওয়ার্কার ভিসা স্পনসর করার ক্ষমতা পাওয়া প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৪০ শতাংশ এমন শিল্প খাতে ছিল, যেগুলো সাধারণত কম বেতন ও কম দক্ষতার কাজের সঙ্গে যুক্ত।

২০২০ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ব্রিটেনের পয়েন্টভিত্তিক অভিবাসন ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা ঘোষণা করে বলেছিলেন, এর মাধ্যমে উচ্চ বেতন, উচ্চ দক্ষতা ও উচ্চ উৎপাদনশীলতার অর্থনীতি গড়ে উঠবে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে থেকে অদক্ষ কর্মী আসার সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু পরবর্তী সময়ে স্কিল্ড ওয়ার্কার ভিসার আওতায় আসা কর্মীদের বড় একটি অংশ বিজ্ঞানী বা উচ্চ দক্ষতার পেশাজীবী না হয়ে খুচরা ব্যবসা, আতিথেয়তা ও অন্যান্য তুলনামূলক কম বেতনের খাতে কাজ করেছেন। ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বিদেশি কর্মীদের স্পনসর করতে আবেদন করা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ছিল খুচরা ও আতিথেয়তা খাতের।

এই সময়ে শুধু খুচরা ও আতিথেয়তা খাতেই ২৯ হাজার ৪৮৬টি প্রতিষ্ঠান বিদেশি কর্মীদের জন্য স্পনসরশিপ সার্টিফিকেট দিয়েছে। এই সার্টিফিকেট স্কিল্ড ওয়ার্কার ভিসার আবেদনের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলেও এটি পাওয়া মানেই সংশ্লিষ্ট কর্মীর স্কিল্ড ওয়ার্কার ভিসা নিশ্চিত হওয়া নয়।

তবে তথ্যের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো ব্যবসাগুলোর ধরন। বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ১৮৮টি চিকেন শপ স্কিল্ড ওয়ার্কার ভিসার জন্য কর্মী স্পনসর করার ক্ষমতা পেয়েছে। পাশাপাশি ৬২টি ভ্যাপের দোকান এবং ২০টি গাড়ি ধোয়ার প্রতিষ্ঠানও এই অনুমোদন পেয়েছে।

এ ছাড়া অন্তত ৬৪৩টি চুল ও সৌন্দর্যসেবা প্রতিষ্ঠান বিদেশি কর্মী স্পনসর করার অনুমতি পেয়েছে। এর মধ্যে বেশ কিছু ছিল নেইল বার। এমনকি বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও এই ব্যবস্থার আওতায় বিদেশি কর্মী স্পনসর করেছে। তথ্য অনুযায়ী, গির্জা, মসজিদ ও সিনাগগসহ ৩৪০টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এই তালিকায় ছিল।

এর বিপরীতে অর্থ ও বিমা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশি কর্মী নিয়োগের জন্য আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানের মাত্র ৩ দশমিক ১ শতাংশ ছিল। ফলে স্কিল্ড ওয়ার্কার ভিসা ব্যবস্থা বাস্তবে কতটা উচ্চ দক্ষতার কর্মীদের লক্ষ্য করে পরিচালিত হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

অক্সফোর্ডের মাইগ্রেশন অবজারভেটরির বেন ব্রিন্ডল বলেন, কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান হয়তো নিয়মের মূল উদ্দেশ্যকে পাশ কাটিয়ে থাকতে পারে। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই আইন ভাঙা হয়েছে এমনটা বলা যায় না। তার মতে, তাত্ত্বিকভাবে কোন ধরনের প্রতিষ্ঠান বিদেশি কর্মী নিয়োগ করতে পারবে, সে বিষয়ে খুব বেশি নিষেধাজ্ঞা ছিল না।

বার্মিংহামের স্ট্র্যাটফোর্ড রোড এই বিতর্কের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে উঠে এসেছে। লন্ডনের বাইরে খুচরা ব্যবসা, আতিথেয়তা ও নির্মাণ খাতে স্কিল্ড ওয়ার্কার ভিসা স্পনসর করার অনুমোদন পাওয়া প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বেশি ঘনত্ব এই এলাকায় বলে দ্য টেলিগ্রাফের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

স্পার্কহিল এলাকার মধ্য দিয়ে যাওয়া এই সড়কে পোশাকের দোকান, গয়নার দোকান, ট্রাভেল এজেন্সি, খাবারের দোকানসহ বিভিন্ন ব্যবসা রয়েছে। এর অনেক প্রতিষ্ঠান বিদেশি কর্মীদের স্কিল্ড ওয়ার্কার ভিসার জন্য স্পনসর করার অনুমতি পেয়েছে।

স্পার্কহিল এলাকায় ১৯৫০-এর দশক থেকেই বড় পাকিস্তানি সম্প্রদায়ের বসবাস। স্থানীয় এক মোবাইল ফোনের দোকানের মালিকের দাবি, রেস্তোরাঁর মতো কঠিন কাজে ব্রিটিশ কর্মীদের দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করানো কঠিন। তার মতে, বিদেশি কর্মীরা দীর্ঘ সময় কাজ করতে আগ্রহী হওয়ায় অনেক ব্যবসা তাদের নিয়োগে আগ্রহী।

স্কিল্ড ওয়ার্কার ভিসার মাধ্যমে বিদেশি কর্মী আনতে নিয়োগকর্তাদের অবশ্য বেশ কিছু খরচ বহন করতে হয়। ২০২১ সালে পয়েন্টভিত্তিক ব্যবস্থা চালুর সময় সাধারণভাবে স্কিল্ড ওয়ার্কার ভিসার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম বেতন ছিল বছরে ২৫ হাজার ৬০০ পাউন্ড।

কর্মী সংকটে থাকা কিছু খাতে এই বেতনসীমা আরও কম ছিল। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা ২০ হাজার ৪৮০ পাউন্ড পর্যন্ত নেমে যেত। বর্তমানে সাধারণ বেতনসীমা বাড়িয়ে ৪১ হাজার ৭০০ পাউন্ড করা হয়েছে, যদিও নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম রয়েছে।

ছোট প্রতিষ্ঠানকে স্পনসর লাইসেন্সের জন্য এককালীন ৬১১ পাউন্ড দিতে হয়। প্রতিটি স্পনসরশিপ সার্টিফিকেটের জন্য দিতে হয় ৫২৫ পাউন্ড। এর পাশাপাশি কর্মীপ্রতি বছরে ৪৮০ পাউন্ড ইমিগ্রেশন স্কিলস চার্জ দিতে হয়। নিয়োগ-সংক্রান্ত অন্যান্য খরচও রয়েছে।

তারপরও বহু প্রতিষ্ঠান বিদেশি কর্মী স্পনসর করেছে। এ কারণে প্রশ্ন উঠেছে, এসব প্রতিষ্ঠান প্রকৃত দক্ষ কর্মীর ঘাটতি পূরণের জন্য স্কিল্ড ওয়ার্কার ভিসা ব্যবহার করেছে, নাকি তুলনামূলক কম খরচে শ্রমিক পাওয়ার সুযোগ হিসেবে এই ব্যবস্থা কাজে লাগিয়েছে।

স্কিল্ড ওয়ার্কার ভিসা ব্যবস্থাকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো বিদেশি কর্মীদের শোষণ। বার্মিংহামের স্ট্র্যাটফোর্ড রোডের ব্যবসায়ী কারান থাসান দাবি করেন, কিছু নিয়োগকর্তা কর্মীর ব্যাংক হিসাবে প্রয়োজনীয় বেতন দেখিয়ে পরে সেই অর্থের একটি বড় অংশ ফেরত নেওয়ার ব্যবস্থা করেন।

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, কোনো কর্মীর ব্যাংক হিসাবে মাসে ৩ হাজার পাউন্ড বেতন দেখানো হতে পারে। পরে তাকে ২ হাজার পাউন্ড নিয়োগকর্তাকে ফেরত দিতে বাধ্য করা হয়। ফলে কর্মীর হাতে প্রকৃতপক্ষে থাকে মাত্র ১ হাজার পাউন্ড।

ওয়ার্ক রাইটস সেন্টারের প্রধান নির্বাহী ডোরা-অলিভিয়া ভিকল বলেন, স্কিল্ড ওয়ার্কার ভিসা ব্যবস্থা চালুর পর থেকে তারা এ ধরনের বহু ঘটনা দেখেছেন। তার মতে, এই ব্যবস্থায় নিয়োগকর্তার হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা থাকায় সেটির অপব্যবহার করা সহজ।

ব্রিটেনে স্কিল্ড ওয়ার্কার ভিসায় থাকা কর্মীর বৈধ অভিবাসন অবস্থান নির্দিষ্ট নিয়োগকর্তার সঙ্গে যুক্ত থাকায় চাকরি হারানো বা নিয়োগকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা অনেক সময় কর্মীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

ভিকল জানান, একটি পরিবার উচ্চ দক্ষতার চাকরি করার আশায় স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে ব্রিটেনে এসেছিল। কিন্তু পরে ওই ব্যক্তিকে ওয়েটার ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ করতে বাধ্য করা হয়। পরিবারটি নিয়োগকর্তার দেওয়া বাসস্থানে থাকায় পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসাও কঠিন হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত আধুনিক দাসত্বের অভিযোগে একটি রেফারেল তাদের সহায়তা করে।

এ ধরনের আরও ঘটনায় কেউ ঘণ্টায় মাত্র ৪ পাউন্ড আয় করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আবার কোনো কোনো পরিচর্যা কর্মীকে দীর্ঘ সময় ধরে কোনো বিরতি ছাড়াই কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছে।

ভিকল এমন একজন পরিচর্যা কর্মীর কথা উল্লেখ করেন, যিনি ৬০ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতেন, অথচ খুব সামান্য বেতন পেতেন। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অসহায় মানুষের পরিচর্যার জন্য অর্থও পেত।

কিছু ক্ষেত্রে নিজ দেশে ভালো পেশা থাকা ব্যক্তিদের ব্রিটেনে জীবন পরিবর্তনকারী চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে হাজার হাজার পাউন্ড নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। পরে তারা প্রতিশ্রুত চাকরি না পেয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন।

ভিকলের মতে, কোনো প্রতিষ্ঠান হোম অফিসের স্কিল্ড ওয়ার্কার ভিসা স্পনসর তালিকায় থাকলে বিদেশি কর্মীদের কাছে সেটি বৈধ ও বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে কিছু কর্মী ভয়াবহ প্রতারণার শিকার হয়েছেন।

তিনি জানান, এমন মানুষও রয়েছেন যারা সর্বস্বান্ত হয়ে গির্জার মেঝেতে রাত কাটাতে বাধ্য হয়েছেন। কেউ কেউ গুরুতর মানসিক সংকটেও পড়েছেন।

একটি পরিচর্যা প্রতিষ্ঠানের উদাহরণ দিয়ে ভিকল বলেন, প্রতিষ্ঠানটি যখন স্পনসর লাইসেন্স পেয়েছিল, তখন সেখানে মাত্র ১২ জন কর্মী ছিল। অথচ এক বছরের মধ্যে হোম অফিস ওই প্রতিষ্ঠানকে ১ হাজার ২৩৪টি স্পনসরশিপ সার্টিফিকেট দিয়েছিল।

ব্রেক্সিটের পর হোম অফিস এখন সবচেয়ে বেশি সংখ্যক স্পনসর লাইসেন্স বাতিল করেছে। এতে অনিয়মকারী নিয়োগকর্তাদের বিরুদ্ধে নজরদারি ও ব্যবস্থা নেওয়া বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

তবে শ্রম অধিকার বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, অনিয়মকারী নিয়োগকর্তাদের বিরুদ্ধে বর্তমান শাস্তির ব্যবস্থা যথেষ্ট কঠোর নয়। অ্যান্টি-ট্রাফিকিং অ্যান্ড লেবার এক্সপ্লয়টেশন ইউনিটের আইনজীবী ও সহপ্রতিষ্ঠাতা জামিলা ডানকান-বোসু বলেন, স্কিল্ড ওয়ার্কার ভিসা ব্যবস্থায় কর্মী শোষণের সুযোগ থাকলে তা শুধু বিদেশি কর্মীদের নয়, ব্রিটিশ কর্মীদেরও ক্ষতি করতে পারে।

তার মতে, একজন কর্মীকে নির্দিষ্ট নিয়োগকর্তার সঙ্গে বেঁধে রাখলে শোষণের ঝুঁকি তৈরি হয়। কোনো প্রতিষ্ঠান যদি শোষিত শ্রম ব্যবহার করে কম খরচে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারে, তাহলে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকেও প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে একই ধরনের পথে যাওয়ার চাপ তৈরি হতে পারে।

কনজারভেটিভ পার্টির মধ্যেও এখন ‘বরিসওয়েভ’ নিয়ে আত্মসমালোচনা শুরু হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক টোরি এমপি বলেন, অভিবাসনের ক্ষেত্রে সরকার অতিরিক্ত শিথিল ছিল এবং অনেক বিদেশি কর্মী কম বেতনের চাকরিতে প্রবেশ করায় ব্রিটিশ কর্মীদের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।

সাবেক অভিবাসনমন্ত্রী রবার্ট জেনরিক ‘বরিসওয়েভ’-কে এক প্রজন্মের মধ্যে সবচেয়ে বড় সরকারি নীতিগত ব্যর্থতাগুলোর একটি বলে মন্তব্য করেছেন। তার অভিযোগ, কাবাবের দোকান, নেইল বারসহ কিছু প্রতিষ্ঠান সংগঠিত অভিবাসন জালিয়াতির আড়াল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে এবং হোম অফিসের নজরদারি ছিল অপর্যাপ্ত।

এদিকে ব্রিটেনে স্কিল্ড ওয়ার্কার ভিসায় আসা কর্মীর সংখ্যা সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২৩ সালে যুক্তরাজ্য সরকারের অনুমোদিত কর্মী ভিসার সংখ্যা ৬ লাখ ১৩ হাজার ৬২৭-এ পৌঁছেছিল। জুন পর্যন্ত এক বছরে সেই সংখ্যা কমে ২ লাখ ৩৪ হাজার ৮৪১ হয়েছে।

একই সময়ে ব্রিটেনের নিট অভিবাসনও কমেছে। ২০২৩ সালের মার্চ পর্যন্ত ১২ মাসে নিট অভিবাসন রেকর্ড ৯ লাখ ৪৪ হাজারে পৌঁছেছিল। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১২ মাসে তা কমে ১ লাখ ৭১ হাজারে দাঁড়িয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে সরকার স্কিল্ড ওয়ার্কার ভিসার যোগ্যতার শর্তও কঠোর করেছে। ফলে কম দক্ষতার চাকরিতে বিদেশি কর্মী আনার সুযোগ ভবিষ্যতে আরও সীমিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে ব্রিটেনে থাকা কিছু অভিবাসীও নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবছেন। বার্মিংহামের একটি ভিসা ও ট্রাভেল এজেন্সিতে কর্মরত এক নারীর দাবি, স্কিল্ড ওয়ার্কার ভিসাসহ বিভিন্ন ভিসায় ব্রিটেনে আসা কিছু মানুষের কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেছে এবং তাদের ভিসাও বাতিল হয়েছে। তাদের কেউ কেউ এখন অন্য দেশে যাওয়ার কথা ভাবছেন।

ব্রিটেনে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাওয়ার সময়সীমা পাঁচ বছর থেকে ১০ বা ১৫ বছর করার আলোচনা নিয়েও কিছু অভিবাসীর মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অনেকেই যুক্তরাজ্যে দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে চিন্তা করছেন এবং ইউরোপের অন্য দেশে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন।

তবে স্কিল্ড ওয়ার্কার ভিসায় আসা সব কর্মীকে একইভাবে দেখার সুযোগ নেই। বহু বিদেশি কর্মী বৈধভাবে ব্রিটেনে এসে নিয়ম মেনে চাকরি করেছেন, কর দিয়েছেন এবং জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার জন্য অর্থও প্রদান করেছেন।

তাই বর্তমান বিতর্কের মূল প্রশ্ন অভিবাসীরা বৈধভাবে ব্রিটেনে আসবেন কি না—শুধু সেটি নয়। বরং স্কিল্ড ওয়ার্কার ভিসা ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রকৃত দক্ষ কর্মী আনা হচ্ছে কি না, নিয়োগকর্তারা নিয়ম মেনে বেতন দিচ্ছেন কি না এবং বিদেশি কর্মীদের শোষণ ও প্রতারণা থেকে রক্ষা করতে হোম অফিস যথেষ্ট ব্যবস্থা নিচ্ছে কি না—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বরিস জনসনের সময় চালু হওয়া অভিবাসন ব্যবস্থার উত্তরাধিকার হিসেবে ‘বরিসওয়েভ’ এখন ব্রিটিশ রাজনীতির অন্যতম বিতর্কিত বিষয়। আর চিকেন শপ, নেইল বার, ভ্যাপের দোকান ও গাড়ি ধোয়ার প্রতিষ্ঠানের মতো ব্যবসার স্কিল্ড ওয়ার্কার ভিসা স্পনসর হওয়ার তথ্য সেই বিতর্ককে আরও তীব্র করে তুলেছে।

সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ

এম.কে

Categories
বাংলাদেশ

বাংলাদেশের দুই তরুণ-তরুণীর ভিন্ন পথচলাঃ উচ্চশিক্ষায় অসাধারণ সাফল্য

২০১৫ সালে বিয়ে করেছিলেন সিনায়াত মাহজাবীন ও আবির হাসান। দুজনের পড়াশোনার বিষয় আলাদা, গবেষণার ক্ষেত্রও ভিন্ন। কিন্তু উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন তাদের দুজনকেই নিয়ে গেছে যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। নিজেদের স্বপ্ন পূরণের পাশাপাশি তারা একে অপরের পথচলারও সহযোগী হয়েছেন।

সিনায়াত ঢাকার নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি থেকে ফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্সেসে স্নাতক সম্পন্ন করেন। অন্যদিকে আবির হাসান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর করেন।

উচ্চশিক্ষা নিয়ে দুজনেরই ছিল বড় স্বপ্ন। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে নিজেদের সক্ষমতা যাচাই করা, নতুন পরিবেশে শেখা এবং গবেষণার সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকেই তারা বিদেশে পড়াশোনার প্রস্তুতি শুরু করেন।

অক্সফোর্ডে যাওয়ার প্রথম সুযোগটি পান আবির। জননীতি বিষয়ে স্নাতকোত্তর করার সুযোগ পেলেও একই সময়ে বিশ্বব্যাংকে কাজের প্রস্তাব পান তিনি। পেশাগত সুযোগটি গ্রহণ করে অক্সফোর্ডে ভর্তি এক বছর পিছিয়ে দেন আবির।

এই সময় তিনি স্ত্রী সিনায়াতকেও অক্সফোর্ডে আবেদন করতে উৎসাহিত করেন। সিনায়াত অক্সফোর্ডের পাশাপাশি ডেনমার্কের কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়েও আবেদন করেছিলেন। ডেনিশ সরকারের বৃত্তিসহ সেখানে পড়ার সুযোগ পেলেও শেষ পর্যন্ত তিনি অক্সফোর্ডকেই বেছে নেন।

এর অন্যতম কারণ ছিল—দুজন একই সময়ে একই শহরে থেকে উচ্চশিক্ষার নতুন অধ্যায় শুরু করতে চেয়েছিলেন। সিনায়াতের ভাষায়, তাদের অক্সফোর্ডযাত্রা শুধু দুজনের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার গল্প নয়; বরং একে অপরের স্বপ্নকে জায়গা দেওয়া এবং জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পরস্পরকে সহযোগিতা করার গল্পও।

অক্সফোর্ডে পড়াশোনার সময় দুজনের ব্যস্ততা ছিল নিজ নিজ গবেষণা ও কাজ নিয়ে। আবিরের আগ্রহ ছিল জননীতি, অর্থনীতি ও উন্নয়ন নিয়ে। অন্যদিকে সিনায়াতের গবেষণার জগৎ ছিল ফার্মাকোলজি ও জীববিজ্ঞানকেন্দ্রিক।

তবু দিনের শেষে তারা নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতেন। নতুন কোনো বিষয় শেখা, কঠিন চ্যালেঞ্জ, পড়াশোনার চাপ কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা—সবকিছু নিয়েই চলত তাদের আলোচনা।

তাদের সম্পর্কের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল, কেউ কাউকে নিজের পছন্দের পথে পরিচালিত করার চেষ্টা করেননি। বরং দুজন নিজেদের আলাদা পথকে স্বাধীনভাবে অনুসরণ করেও পাশাপাশি থাকার চেষ্টা করেছেন।

অক্সফোর্ডের অধ্যায় শেষ হওয়ার পর সিনায়াতের গবেষণার পথ তাকে নিয়ে যায় কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে। দেশে ফিরে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার সময় গবেষণার প্রতি তার আগ্রহ আরও গভীর হয়। পরে ইউসুফ জামিল বৃত্তি নিয়ে ফার্মাকোলজিতে পিএইচডি করেন তিনি।

সিনায়াতের গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল মানুষের শরীরের কোষে ক্যালসিয়াম কীভাবে সংকেত আদান-প্রদান করে। কোষের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে এই সংকেতব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় সমস্যা হলে বিভিন্ন রোগের সঙ্গে এর সম্পর্ক তৈরি হতে পারে।

তার গবেষণার লক্ষ্য ছিল এমন নতুন অণু শনাক্ত করা, যা এই প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং ভবিষ্যতে ওষুধ তৈরির গবেষণায় কাজে লাগতে পারে।

অন্যদিকে আবিরের গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের রপ্তানি খাত। কীভাবে তৈরি পোশাকের মতো সীমিত কয়েকটি খাতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নতুন শিল্প ও রপ্তানি খাত গড়ে তোলা যায় এবং দীর্ঘমেয়াদে প্রয়োজনীয় নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার করা সম্ভব—এসব বিষয় নিয়ে কাজ করছেন তিনি।

বর্তমানে আবির অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টমেন্ট অব ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্টে পিএইচডি গবেষণা করছেন। আর সিনায়াত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত থেকে দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগের একটি আন্তর্জাতিক ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ব্যবস্থাপনার কাজে যুক্ত আছেন।

দুজনের গবেষণার বিষয় একেবারেই আলাদা হলেও নিজেদের অভিজ্ঞতা তারা বাংলাদেশের শিক্ষার্থী ও তরুণ গবেষকদের কাজে লাগাতে চান। তাদের মতে, অক্সফোর্ড বা কেমব্রিজে পড়াশোনা অবশ্যই বড় অর্জন; কিন্তু এই পথচলার সবচেয়ে বড় শিক্ষা শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম নয়।

তরুণদের প্রতি তাদের বার্তা হলো—নিজের স্বপ্নকে গুরুত্ব দিতে হবে এবং তা বাস্তবায়নে ধৈর্য ও পরিশ্রম করতে হবে। প্রত্যাখ্যান এলে আবার চেষ্টা করতে হবে, নিজের সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়েও নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করতে হবে এবং নিজের পথকে অন্যের পথের সঙ্গে তুলনা করা উচিত নয়।

তাদের দৃষ্টিতে সাফল্য শুধু কোথায় পৌঁছানো হয়েছে, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং সেই পথে কী শেখা হয়েছে এবং পরবর্তী সময়ে সেই শিক্ষা অন্যদের জন্য কীভাবে কাজে লাগানো যায়—সাফল্যের প্রকৃত মূল্য সেখানেই।

সূত্রঃ প্রথম আলো প্রতিবেদন

এম.কে

Categories
বাংলাদেশ

বিদেশ ভ্রমণে বার্ষিক ব্যয়সীমা বাড়িয়ে ১৮ হাজার ডলার করল বাংলাদেশ ব্যাংক

বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশি নাগরিকদের বার্ষিক বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের সীমা বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এখন থেকে একজন প্রাপ্তবয়স্ক বাংলাদেশি নাগরিক এক পঞ্জিকাবর্ষে বিদেশ ভ্রমণের জন্য সর্বোচ্চ ১৮ হাজার মার্কিন ডলার বা সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করতে পারবেন। এতদিন এই সীমা ছিল ১২ হাজার ডলার।

রোববার এ বিষয়ে একটি পরিপত্র জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন নির্দেশনার ফলে বিদেশ ভ্রমণের জন্য অনুমোদিত ডিলার বা এডি ব্যাংকগুলো একজন প্রাপ্তবয়স্ক বাংলাদেশি নাগরিককে এক বছরে সর্বোচ্চ ১৮ হাজার ডলার বা সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ছাড় করতে পারবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, বাংলাদেশি নাগরিকদের বিদেশ ভ্রমণসংক্রান্ত বৈদেশিক মুদ্রার ‘প্রকৃত চাহিদা’ পূরণ এবং আন্তর্জাতিক ভ্রমণের পরিবর্তিত প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে বার্ষিক ব্যয়সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তবে ভ্রমণ ব্যয়ের মোট সীমা ১৮ হাজার ডলারে উন্নীত হলেও নগদ বৈদেশিক মুদ্রা সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে আগের নিয়মই বহাল থাকছে। অর্থাৎ, একজন ভ্রমণকারী সর্বোচ্চ ৫ হাজার মার্কিন ডলার নোট আকারে নিতে পারবেন।

বাকি অর্থ ভ্রমণসংক্রান্ত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের অনুমোদিত অন্যান্য পদ্ধতিতে ব্যয় করা যাবে। ফলে নতুন সিদ্ধান্তে ভ্রমণকারীদের মোট বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের সুযোগ বাড়লেও হাতে নগদ ডলার বহনের সীমায় কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি।

১২ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রেও আগের নিয়ম বহাল রাখা হয়েছে। তারা প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য নির্ধারিত ভ্রমণসীমার ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের সুযোগ পাবে। নতুন সীমা অনুযায়ী, ১২ বছরের কম বয়সী একজন শিশু এক পঞ্জিকাবর্ষে সর্বোচ্চ ৯ হাজার ডলার বা সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের সুযোগ পাবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা নীতি বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ১২ বছরের বেশি বয়সীদের প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে বিবেচনা করে বছরে ১৮ হাজার ডলার পর্যন্ত ভ্রমণ কোটা দেওয়া হবে। এর চেয়ে কম বয়সীদের ‘মাইনর’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং তারা প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় অর্ধেক সীমা ব্যবহার করতে পারবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তের ফলে বিদেশ ভ্রমণকারী বাংলাদেশিদের বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ল। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক ভ্রমণের ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিদেশে ভ্রমণসংক্রান্ত বিভিন্ন খাতে বেশি অর্থের প্রয়োজনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এই সীমা পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।

এর আগে একজন প্রাপ্তবয়স্ক বাংলাদেশি নাগরিকের বিদেশ ভ্রমণের জন্য বছরে সর্বোচ্চ ১২ হাজার ডলার পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের সুযোগ ছিল। নতুন সিদ্ধান্তে সেই সীমা ৬ হাজার ডলার বাড়িয়ে ১৮ হাজার ডলার করা হয়েছে।

তবে নগদ ডলার বহনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫ হাজার ডলারের সীমা অপরিবর্তিত থাকায় ভ্রমণকারীদের পুরো ১৮ হাজার ডলার নোট আকারে সঙ্গে নেওয়ার সুযোগ থাকছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, বিদেশ ভ্রমণের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা ছাড়ের ক্ষেত্রে অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকগুলো নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করবে। ফলে ভ্রমণকারীদের বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের প্রক্রিয়া ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের নিয়ম মেনে চলতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক ভ্রমণের পরিবর্তিত বাস্তবতা এবং বাংলাদেশি নাগরিকদের বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সূত্রঃ বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা পরিপত্র/সার্কুলার

এম.কে

Categories
আন্তর্জাতিক যুক্তরাজ্য (UK)

‘প্রকৃত যুদ্ধের শুরু’—লাভরভের হুঁশিয়ারি, কিয়েভে জার্মানি-যুক্তরাজ্যের নিরাপত্তা উপদেষ্টা

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে ঘিরে জার্মানি ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে রাশিয়ার কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাগত উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। জার্মানির লেইপজিগ বিমানবন্দরে বিস্ফোরকভর্তি ড্রোন পাওয়ার ঘটনায় মস্কোকে দায়ী করার পর বার্লিন রাশিয়ার একটি কনস্যুলেট ও একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই ঘটনায় লন্ডন রাশিয়ার চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সকে তলব করে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে।

গত ৪ আগস্ট জার্মানির লেইপজিগ বিমানবন্দরে একটি ইউক্রেনীয় বিমানের কাছে বিস্ফোরকভর্তি একটি ড্রোন শনাক্ত করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিমানবন্দরের রানওয়ে সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং পরে ড্রোনটি নিষ্ক্রিয় করা হয়।

জার্মান সরকারের দাবি, গোয়েন্দা তথ্য ও তদন্তের ভিত্তিতে ঘটনাটির পেছনে রাশিয়ার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। বার্লিনের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ইউরোপজুড়ে রাশিয়ার পরিচালিত বৃহত্তর ‘হাইব্রিড অপারেশন’-এর অংশ হতে পারে।

তদন্তে রাশিয়ায় জন্মগ্রহণকারী এক লাতভীয় নাগরিক এবং এক বেলারুশীয় নাগরিকের নামও সামনে এসেছে। তাদের একজনকে লজিস্টিকস সমন্বয়ের সঙ্গে এবং অন্যজনকে প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ঘটনার পর জার্মান সরকার রাশিয়ার একটি কনস্যুলেট বন্ধ করার পাশাপাশি বার্লিনে থাকা রাশিয়ার একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে। বার্লিনের এই সিদ্ধান্ত মস্কোর সঙ্গে বিদ্যমান উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

জার্মানির পদক্ষেপের কঠোর সমালোচনা করেছেন রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জের জার্মানিকে ইউরোপের প্রধান সামরিক শক্তিতে পরিণত করার বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে লাভরভ অভিযোগ করেন, মের্জের নীতিগুলো কার্যত রাশিয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার দিকেই এগোচ্ছে।

লাভরভের ভাষায়, লেইপজিগের ঘটনাকে কেন্দ্র করে জার্মানির নেওয়া পদক্ষেপকে ‘মোটামুটিভাবে প্রকৃত যুদ্ধের শুরু’ হিসেবে দেখা যেতে পারে। অন্যদিকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন জার্মানির নিষেধাজ্ঞা ও পাল্টা পদক্ষেপকে ‘আরেকটি ভুল’ বলে মন্তব্য করেছেন।

তবে রাশিয়ার বার্লিন দূতাবাস লেইপজিগ বিমানবন্দর ঘটনার সঙ্গে মস্কোর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

এদিকে একই ঘটনার জেরে যুক্তরাজ্যও কূটনৈতিকভাবে সরব হয়েছে। লন্ডন রাশিয়ার চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সকে তলব করে লেইপজিগের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

এর পাশাপাশি যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানির জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টারা কিয়েভে অবস্থান করছেন বলে রয়টার্সের একটি সূত্র জানিয়েছে। ইউক্রেনের সঙ্গে পশ্চিমা মিত্রদের নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সঙ্গে কিয়েভের আলোচনায় ইউরোপীয় সমর্থন অব্যাহত রাখার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই এই সফর হচ্ছে বলে জানা গেছে।

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে স্পষ্ট হচ্ছে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে ঘিরে ইউরোপের প্রধান দেশগুলোর নিরাপত্তা উদ্বেগ এখন শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে অস্ত্র ও সামরিক সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। অবকাঠামো, বিমানবন্দর, সাইবার নিরাপত্তা ও অন্যান্য ক্ষেত্রে সম্ভাব্য রুশ ‘হাইব্রিড হুমকি’ মোকাবিলাতেও ইউরোপীয় দেশগুলো সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করছে।

লেইপজিগ বিমানবন্দরকে ঘিরে অভিযোগ, জার্মানির পাল্টা ব্যবস্থা, যুক্তরাজ্যের কূটনৈতিক প্রতিবাদ এবং কিয়েভে তিন ইউরোপীয় দেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের উপস্থিতি—সব মিলিয়ে রাশিয়া ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে উত্তেজনা আরও গভীর হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। যদিও জার্মানি ও যুক্তরাজ্য এখনো রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়ায়নি, কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা পর্যায়ে তাদের অবস্থান ক্রমেই কঠোর হচ্ছে।

সূত্রঃ স্কাই নিউজ

এম.কে

Categories
যুক্তরাজ্য (UK)

গোপনাঙ্গ বড় করতে গিয়ে মারা গেলেন ব্রিটিশ-নাইজেরীয় ইনফ্লুয়েন্সার

বিলাসবহুল জীবনযাপন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের জাঁকজমকপূর্ণ জীবন তুলে ধরার জন্য পরিচিত ব্রিটিশ-নাইজেরীয় ব্যবসায়ী ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনফ্লুয়েন্সার ইঘো ‘টাইনি’ উবিরিবোর মৃত্যু হয়েছে থাইল্যান্ডে কসমেটিক চিকিৎসা নেওয়ার পর। ২০২৬ সালের মার্চে ব্যাংককে ছুটি কাটাতে গিয়ে স্থানীয় একটি ক্লিনিকে চিকিৎসা নেওয়ার পর তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে।

অনলাইনে তিনি ‘ডেনিসি’ ও ‘ইগো’ নামেও পরিচিত ছিলেন। মৃত্যুর সময় তার বয়স হয়েছিল ৪৩ বছর। স্ত্রী ড্যানিয়েল সিম্বা অ্যালেনকে সঙ্গে নিয়ে তিনি ব্যাংককে অবস্থান করছিলেন এবং একটি ম্যারিয়ট হোটেলে উঠেছিলেন।

ভ্রমণের সময় উবিরিবো ব্যক্তিগত বিশেষ অঙ্গ বড় করার উদ্দেশ্যে স্থানীয় একটি ক্লিনিকে কসমেটিক চিকিৎসা করান। ওই প্রক্রিয়ায় প্রায় ৪০ মিলিলিটার হায়ালুরোনিক অ্যাসিড ফিলার এবং জেনারেল অ্যানেস্থেসিয়া ব্যবহার করা হয়েছিল।

চিকিৎসা শেষ হওয়ার পর স্ত্রীকে নিয়ে তারা হোটেলে ফিরে যান। পরে দুজন ম্যাসাজ নিতে গেলে পরিস্থিতি হঠাৎ বদলে যায়। ম্যাসাজ চলাকালে উবিরিবো বুকে ব্যথার কথা জানান। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। তিনি দুবার অচেতন হয়ে পড়ার পর অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে সুখুমভিত হাসপাতালে নেওয়া হয়।

হাসপাতালে নেওয়ার পর প্রথমদিকে তিনি চিকিৎসকদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো সচেতন ছিলেন। তার স্ত্রী চিকিৎসকদের জানান, ওই দিনই উবিরিবো কসমেটিক চিকিৎসা করিয়েছিলেন। চিকিৎসকেরা তার অবস্থার কারণ নির্ণয়ের জন্য সিটি স্ক্যান করার পরামর্শ দেন। কিন্তু পরীক্ষা সম্পন্ন হওয়ার আগেই তিনি আবার জ্ঞান হারান।

পরবর্তীতে চিকিৎসকেরা বুঝতে পারেন, উবিরিবো পালমোনারি এম্বোলিজমে আক্রান্ত হয়েছেন। এ অবস্থায় ফুসফুসের রক্তনালিতে বাধা সৃষ্টি হয়ে রক্ত চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয় এবং তা জীবনহানির কারণ হতে পারে।

অবস্থা দ্রুত সংকটজনক হয়ে পড়লে তাকে নিবিড় পরিচর্যায় নেওয়া হয়। তাকে বাঁচানোর জন্য চিকিৎসকেরা ১০০ মিনিটেরও বেশি সময় ধরে সিপিআর চালান। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পরও তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। ৬ মার্চ ভোরে তার মৃত্যু হয়।

পরবর্তীতে যুক্তরাজ্যে করা ময়নাতদন্তে তার ফুসফুসে এমন কোষীয় উপাদান পাওয়া যায়, যা ওই কসমেটিক চিকিৎসায় ব্যবহৃত ফিলারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। যুক্তরাজ্যের করোনার জিন হারকিন আনুষ্ঠানিকভাবে রায় দেন, কসমেটিক চিকিৎসার ফলে সৃষ্ট পালমোনারি এম্বোলিজমই উবিরিবোর মৃত্যুর কারণ।

ঘটনাটি কসমেটিক চিকিৎসার ঝুঁকি নিয়েও নতুন করে সতর্কতা তৈরি করেছে। চিকিৎসাবিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ব্যক্তিগত অঙ্গ বড় করার মতো কসমেটিক প্রক্রিয়ায় রক্ত জমাটজনিত জটিলতা, সংক্রমণ, অনুভূতি কমে যাওয়া এবং স্থায়ী দাগের মতো গুরুতর ঝুঁকি থাকতে পারে। এসব চিকিৎসায় বিপুল অর্থ খরচ হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল অনেক ক্ষেত্রে স্থায়ী হয় না এবং প্রভাব কয়েক মাসের মধ্যেই কমে যেতে পারে।

জীবদ্দশায় বিলাসবহুল জীবনযাপনের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের জন্য পরিচিত ছিলেন উবিরিবো। মৃত্যুর পর তার শেষকৃত্যও ছিল অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ। লন্ডনে তাকে সোনালি রঙের একটি বিশেষ কফিনে সমাহিত করা হয়।

প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ওই কফিনটির মূল্য ছিল ৭ লাখ ৪৫ হাজার মার্কিন ডলারেরও বেশি, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৯ কোটি ১৫ লাখ টাকারও বেশি। তার শেষকৃত্যে নাইজেরিয়ার জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী ডেভিডোর উপস্থিতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

উবিরিবোর মৃত্যু কসমেটিক চিকিৎসার নিরাপত্তা এবং বিদেশে এ ধরনের চিকিৎসা নেওয়ার আগে সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য জানার গুরুত্বকে সামনে এনেছে। বিশেষ করে শরীরে ফিলার প্রয়োগের মতো চিকিৎসায় বিরল হলেও প্রাণঘাতী জটিলতা তৈরি হতে পারে—তার মৃত্যুর ঘটনা সেই ঝুঁকিরই ভয়াবহ উদাহরণ হয়ে সামনে এসেছে।

সূত্রঃ টিএমজেড

এম.কে

Categories
যুক্তরাজ্য (UK)

পাবলো এসকোবারের ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করা ভয়ঙ্কর ড্রাগলর্ডকে যুক্তরাজ্যে কারাদণ্ড

যুক্তরাজ্যের গ্রেটার ম্যানচেস্টারে বিপুল পরিমাণ কোকেন ও হেরোইন ছড়িয়ে দেওয়া সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের হোতা তোসিফ মোহাম্মদকে ১৮ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তদন্তে তার নেতৃত্বাধীন চক্রের সঙ্গে প্রায় ১৩০ কেজি ক্লাস-এ মাদকের যোগসূত্র এবং পাঁচ লাখ পাউন্ডেরও বেশি অপরাধলব্ধ অর্থের লেনদেনের তথ্য উঠে এসেছে।

 

ওল্ডহামের অনচান অ্যাভিনিউয়ের বাসিন্দা ৩৬ বছর বয়সী তোসিফ মোহাম্মদ কোকেন সরবরাহের ষড়যন্ত্র, হেরোইন সরবরাহের ষড়যন্ত্র এবং অপরাধলব্ধ সম্পদ স্থানান্তরের ষড়যন্ত্রে দোষী সাব্যস্ত হন। আদালত তাকে ১৮ বছরের কারাদণ্ড দেন।

তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, মোহাম্মদ ছিলেন চক্রটির মূল হোতা। তিনি গ্রেটার ম্যানচেস্টারসহ উত্তর-পশ্চিম ইংল্যান্ডের বিভিন্ন এলাকায় বাণিজ্যিক পরিসরে কোকেন ও হেরোইন সরবরাহের নির্দেশ দিতেন। তার নির্দেশে অন্য সদস্যরা মাদক পৌঁছে দিত এবং ক্রেতাদের কাছ থেকে নগদ অর্থ সংগ্রহ করত।

চক্রটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য মোহাম্মদ ভাকাস আশরাফ, ৩৫, মাদক পরিবহনে কুরিয়ার হিসেবে কাজ করতেন। কোকেন ও হেরোইন সরবরাহের ষড়যন্ত্রে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর তাকে ৭ বছর ৪ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে নিকোলা টফট, ৪৬, অপরাধলব্ধ অর্থ স্থানান্তরের ষড়যন্ত্রে দোষী সাব্যস্ত হন। তাকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হলেও তা ৩০ মাসের জন্য স্থগিত করা হয়েছে।

তদন্তে চাঞ্চল্যকরভাবে উঠে আসে, মোহাম্মদ একজন অসহায় ব্যক্তির বাসাকে মাদক ও নগদ অর্থ লুকিয়ে রাখার নিরাপদ আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করছিলেন।

পুলিশ ওই বাড়িতে অভিযান চালিয়ে প্রায় ৬০ কেজি কোকেন উদ্ধার করে। একই অভিযানে মাদক পরিবহনের জন্য গোপন কুঠুরিযুক্ত একটি গাড়িও জব্দ করা হয়।

পরে মোহাম্মদের সঙ্গে যুক্ত আরও একটি নিরাপদ আস্তানার সন্ধান পায় পুলিশ। সেখানে নগদ অর্থের পাশাপাশি একটি বিস্তারিত দেনাদার তালিকা উদ্ধার করা হয়। ওই তালিকায় ক্রেতাদের নাম, তাদের বকেয়া অর্থ এবং মাদক ব্যবসার পরিমাণের তথ্য ছিল।

তালিকাটি বিশ্লেষণ করে পুলিশ জানতে পারে, ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে চক্রটি আরও প্রায় ৭০ কেজি কোকেন ও হেরোইন সরবরাহ করেছিল। অর্থাৎ ৬০ কেজি মাদক উদ্ধারের পাশাপাশি আরও ৭০ কেজি মাদক সরবরাহের প্রমাণ পাওয়ায় তদন্তে চক্রটির সঙ্গে প্রায় ১৩০ কেজি ক্লাস-এ মাদকের যোগসূত্র পাওয়া যায়।

মাদক ব্যবসার পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থও পরিচালনা করছিল চক্রটি। তদন্তে নিকোলা টফটের মাধ্যমে প্রায় ৪ লাখ ৬০ হাজার পাউন্ড অপরাধলব্ধ অর্থ সরানো ও গোপন করার তথ্য পাওয়া যায়।

২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে মোহাম্মদ প্রায় ৮০ হাজার পাউন্ড নগদ অর্থ টফটের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। পুলিশ তাদের গোপন বৈঠকও পর্যবেক্ষণ করেছিল।

তদন্তে তোসিফ মোহাম্মদের মোবাইল ফোন থেকেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উদ্ধার করা হয়। ফোনের তথ্য ও অন্যান্য উপাদানে দেখা যায়, তিনি তুরস্ক ও কলম্বিয়ায় ভ্রমণ করেছিলেন।

সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো—মোহাম্মদ দাবি করেছিলেন, কলম্বিয়ায় তিনি কুখ্যাত মাদক সম্রাট পাবলো এসকোবারের ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। তবে এটি মোহাম্মদের নিজের দাবি; পুলিশ এটিকে এসকোবার পরিবারের সঙ্গে তার নিশ্চিত অপরাধী সম্পর্ক হিসেবে উপস্থাপন করেনি।

গ্রেটার ম্যানচেস্টার পুলিশের গুরুতর সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন দলের গোয়েন্দা পরিদর্শক রিচার্ড ম্যাককরি বলেন, এটি ছিল অত্যন্ত সুসংগঠিত একটি অপরাধী চক্র, যারা বিপুল পরিমাণ কোকেন ও হেরোইন পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে দিচ্ছিল এবং পাঁচ লাখ পাউন্ডেরও বেশি নগদ অর্থ তৈরি ও স্থানান্তর করছিল।

তার ভাষায়, প্রায় ৬০ কেজি কোকেন উদ্ধার, আরও ৭০ কেজি ক্লাস-এ মাদক সরবরাহের প্রমাণ এবং মাদক ব্যবসার বিস্তারিত হিসাব-নিকাশ উদ্ধার—সব মিলিয়ে চক্রটির কার্যক্রমের ‘শিল্পকারখানার মতো’ বিশাল পরিসর স্পষ্ট হয়েছে।

পুলিশ জানিয়েছে, সাজাপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে অভিযান এখানেই শেষ নয়। সংঘবদ্ধ অপরাধী নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া, তাদের সম্পদ জব্দ করা এবং সংশ্লিষ্টদের কারাগারে পাঠাতে পুলিশ ক্রাউন প্রসিকিউশন সার্ভিসের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাবে।

গ্রেটার ম্যানচেস্টারকে ক্লাস-এ মাদকের ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে এ ধরনের অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রাখার কথাও জানিয়েছে পুলিশ।

সূত্রঃ গ্রেটার ম্যানচেস্টার পুলিশের সরকারি প্রতিবেদন⁠

এম.কে

Categories
যুক্তরাজ্য (UK)

যুক্তরাজ্যে ফজরের নামাজ পড়ে আর বাড়ি ফেরা হলো না ১৬ বছরের ইসমাইলেরঃ গাড়ির ধাক্কায় মর্মান্তিক মৃত্যু

যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামে ভোরের নামাজ শেষে সাইকেল চালিয়ে বাড়ি ফেরার পথে গাড়ির ধাক্কায় ১৬ বছর বয়সী কিশোর মুহাম্মদ ইসমাইল আলমের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।

 

জানা গেছে, ইসমাইল ভোরের নামাজ আদায়ের জন্য বার্মিংহামের গ্রিন লেন মসজিদ অ্যান্ড কমিউনিটি সেন্টারে গিয়েছিলেন। ফজরের নামাজ আদায় শেষে সাইকেল চালিয়ে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন তিনি। পথে ক্যাটেল রোড ও টেম্পলফিল্ড স্ট্রিটের কাছে একটি গাড়ির সঙ্গে তার সংঘর্ষ হয়। গুরুতর আহত হয়ে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু ঘটে।

দুর্ঘটনাটি বার্মিংহাম সিটির ফুটবল মাঠের কাছাকাছি এলাকায় ঘটে। মাত্র কয়েক মিনিট আগেও যে কিশোরটি মসজিদে নামাজ আদায় করছিলেন, তারই এমন আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবার, বন্ধু, শিক্ষক ও স্থানীয় মুসলিম কমিউনিটির মধ্যে গভীর শোক নেমে এসেছে।

ইসমাইল পড়াশোনা করতেন দারুল উলুম বার্মিংহাম ইসলামিক হাই স্কুলে। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্কুল কর্তৃপক্ষ তাকে একজন অসাধারণ শিক্ষার্থী হিসেবে স্মরণ করেছে।

মাত্র ১৬ বছর বয়সেই ইসমাইল পুরো কোরআন মুখস্থ করেছিলেন। কোরআন তিলাওয়াদে তার দক্ষতার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি দুটি আনুষ্ঠানিক সনদও অর্জন করেছিলেন। পাশাপাশি পড়াশোনাতেও তার সাফল্য ছিল উল্লেখযোগ্য।

জিসিএসই পরীক্ষায় তিনি অসাধারণ ফলাফল অর্জন করেছিলেন। শুধু নিজের পড়াশোনা ও ধর্মীয় শিক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না ইসমাইল; অসহায় ও প্রয়োজনগ্রস্ত মানুষের সহায়তায় আয়োজিত বিভিন্ন তহবিল সংগ্রহ কার্যক্রমেও তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন।

স্কুলের ডেপুটি হেড শিক্ষক হাম্মাদ আজহার ইসমাইলের চরিত্র ও ব্যক্তিত্বের প্রশংসা করে তাকে অত্যন্ত সম্মানজনক, দৃঢ়চেতা এবং অন্যদের প্রতি গভীরভাবে যত্নশীল একজন শিক্ষার্থী হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

হাম্মাদ আজহার বলেন, এত অল্প বয়সে ইসমাইল অনেক কিছু অর্জন করলেও তিনি কখনো অহংকারী হয়ে ওঠেননি। বরং সবসময় বিনয়ী, ভদ্র এবং মাটির কাছাকাছি ছিলেন।

তার আচরণের মধ্যেই ইসমাইলের মানবিকতার প্রকাশ ঘটত বলে জানান শিক্ষকরা। তিনি সবার সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন এবং করমর্দন করতেন। কেউ তার সঙ্গে কথা বললে তিনি পুরো মনোযোগ দিয়ে সেই ব্যক্তির কথা শুনতেন।

হাম্মাদ আজহারের ভাষায়, ইসমাইলের মধ্যে এমন একটি স্বাভাবিক গুণ ছিল, যার মাধ্যমে তিনি অন্য মানুষকে অনুভব করাতে পারতেন যে তারা তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ, সম্মানিত এবং মূল্যবান।

মাত্র ১৬ বছর বয়সে একজন কিশোর হিসেবে ধর্মীয় শিক্ষা, একাডেমিক সাফল্য এবং মানবিক কর্মকাণ্ডে ইসমাইলের অর্জন তাকে তার সহপাঠী ও শিক্ষকদের কাছে বিশেষ করে তুলেছিল।

তার এমন আকস্মিক ও মর্মান্তিক মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে দারুল উলুম বার্মিংহাম ইসলামিক হাই স্কুল। একই সঙ্গে ইসমাইলের পরিবার, বন্ধু, শিক্ষক ও স্বজনদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

ফজরের নামাজ আদায় করে সাইকেলে বাড়ি ফেরার পথে একটি সড়ক দুর্ঘটনায় ইসমাইলের জীবন থেমে যাওয়ার ঘটনায় তার পরিচিতজনদের মধ্যে নেমে এসেছে গভীর শোক। অল্প বয়সে তার অর্জন ও মানুষের প্রতি তার সহানুভূতিশীল আচরণের স্মৃতি এখন পরিবার, শিক্ষক ও সহপাঠীদের কাছে বেদনার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

সূত্রঃ ডেইলি মিরর

এম.কে

Categories
যুক্তরাজ্য (UK)

লন্ডনের কাছেই ‘গ্রামের মতো’ জীবনঃ যুক্তরাজ্যের অন্যতম সুন্দর শহর উইনচেস্টার

লন্ডনের ব্যস্ত নগরজীবন থেকে মাত্র এক ঘণ্টার ট্রেনযাত্রা দূরে এমন একটি শহর রয়েছে, যেখানে বসবাস করেও গ্রামের মতো শান্ত ও ঘনিষ্ঠ পরিবেশ উপভোগ করা যায়। শহরটির নাম উইনচেস্টার। লন্ডনের ওয়াটারলু স্টেশন থেকে সাউথ ওয়েস্টার্ন রেলওয়ের ট্রেনে প্রায় এক ঘণ্টায় পৌঁছানো যায় এই ঐতিহাসিক শহরে।

প্রায় ৪৮ হাজার মানুষের বসবাস উইনচেস্টারে। শহরটিতে রয়েছে বিস্তীর্ণ সবুজ এলাকা, ঐতিহাসিক স্থাপনা, স্বাধীনভাবে পরিচালিত দোকান, পথের বাজার, পাব এবং শক্তিশালী স্থানীয় কমিউনিটি। এসব কারণে এক দিনের ভ্রমণের পাশাপাশি স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্যও শহরটি আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।

তবে সৌন্দর্য ও জীবনযাত্রার মানের সঙ্গে এখানে রয়েছে তুলনামূলক বেশি বাড়ির দামও। মাইলন্ডনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উইনচেস্টারে একটি বাড়ির দাম গড়ে প্রায় ৬ লাখ ১৬ হাজার ৩৪৯ পাউন্ড। একই সময়ে লন্ডনের গড় বাড়ির দাম প্রায় ৬ লাখ ৬৩ হাজার ৩৪৮ পাউন্ড। অর্থাৎ লন্ডনের তুলনায় উইনচেস্টারে বাড়ির দাম প্রায় ৫০ হাজার পাউন্ড কম হলেও শহরটি এখনো যুক্তরাজ্যের ব্যয়বহুল আবাসিক এলাকাগুলোর একটি।

শহরটির জনপ্রিয়তার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাসও। ২০১৬ সালে ‘সানডে টাইমস বেস্ট প্লেসেস টু লিভ’ গাইডে উইনচেস্টারকে যুক্তরাজ্যে বসবাসের জন্য সেরা স্থান হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছিল।

ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য উইনচেস্টারে রয়েছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উইনচেস্টার ক্যাথেড্রাল। ইউরোপ মহাদেশের গথিক ক্যাথেড্রালগুলোর মধ্যে এর নেভ বা মূল দীর্ঘ অভ্যন্তরীণ অংশটি সবচেয়ে দীর্ঘ হিসেবে পরিচিত। এছাড়া রয়েছে দ্য গ্রেট হল এবং হসপিটাল অব সেন্ট ক্রস।

শহরের আরেকটি ঐতিহাসিক আকর্ষণ উইনচেস্টার সিটি মিল। নদী ইচেনের পানির প্রবাহে পরিচালিত এই মিলের ইতিহাস এক হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো এবং এর শিকড় স্যাক্সন যুগ পর্যন্ত বিস্তৃত।

শুধু শহরের মধ্যেই নয়, আশপাশের এলাকাতেও রয়েছে দর্শনীয় স্থান। আল্রেসফোর্ডের রঙিন জর্জিয়ান শহরকেন্দ্র, বিশপস ওয়ালথাম প্যালেসের ধ্বংসাবশেষ এবং স্থানীয় আঙুরের বাগান পর্যটকদের আকর্ষণ করে। স্থানীয় খাবারের পাশাপাশি আঙুরের বাগানে স্পার্কলিং পানীয় উপভোগের সুযোগও রয়েছে।

উইনচেস্টারের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর সামাজিক পরিবেশ। স্থানীয় কাউন্সিলর জন টিপেট-কুপারের মতে, শহরটিতে ঐতিহ্য, সবুজ এলাকা এবং শক্তিশালী কমিউনিটি—সবকিছুর একটি ভারসাম্য রয়েছে। তার ভাষায়, এখানে বসবাস করলে মনে হয় যেন একটি গ্রামে আছেন, অথচ বাস্তবে এটি একটি শহর।

তিনি বলেন, লন্ডনের তুলনায় উইনচেস্টারে প্রতিবেশী, স্থানীয় কমিউনিটি গ্রুপ এবং ক্রীড়া ক্লাবগুলোর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ। স্থানীয় বাসিন্দারা একে অন্যকে সহযোগিতা করেন এবং নিজেদের কমিউনিটির প্রতি এক ধরনের বন্ধন অনুভব করেন।

উইনচেস্টারের জনসংখ্যাও ধীরে ধীরে বৈচিত্র্যময় হচ্ছে। বহু প্রজন্ম ধরে বসবাসকারী স্থানীয়দের পাশাপাশি তরুণ পরিবারও শহরটিতে নতুন করে বসতি স্থাপন করছে। স্যাক্সন, রোমান, ভিক্টোরিয়ান ও এডওয়ার্ডিয়ান যুগের ইতিহাসের মিশ্রণ শহরটির সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

কিং আলফ্রেডের মূর্তি, উইনচেস্টার ক্যাথেড্রাল এবং বাটারক্রস শহরের পরিচিত ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোর মধ্যে অন্যতম। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এসব ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। উইনচেস্টার একসময় স্যাক্সনদের রাজধানী ছিল—এটিও স্থানীয়দের কাছে বিশেষ গর্বের বিষয়।

প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্যও শহরটির রয়েছে বিশেষ আকর্ষণ। শহরের কেন্দ্র থেকে মাত্র পাঁচ মিনিট হাঁটলেই নদী, খোলা মাঠ এবং সংরক্ষিত সবুজ এলাকায় পৌঁছানো যায়। সেখানে নিয়মিত খেলাধুলা ও বিনোদনের সুযোগ রয়েছে। শহরের কাছেই রয়েছে উইনাল মুরস নেচার রিজার্ভ, যা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিশেষভাবে সংরক্ষিত।

আরেক স্থানীয় কাউন্সিলর অ্যান স্মলের মতে, উইনচেস্টার একটি প্রাণবন্ত ও দেশের অন্যতম সুন্দর জায়গা। তিনি স্থানীয়দের কমিউনিটিমুখী মানসিকতার প্রশংসা করে স্বেচ্ছাসেবীদের পরিচালিত স্থানীয় বাস সার্ভিসের কথাও উল্লেখ করেন।

তবে নতুন বাসিন্দাদের জন্য স্থানীয় কমিউনিটির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কাউন্সিলর স্মলের মতে, লন্ডন থেকে আসা মানুষদের স্বাগত জানানো হয়। কিন্তু কেউ যদি স্থানীয় কমিউনিটির অংশ হতে না চান, তখন স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে। তিনি অবশ্য স্পষ্ট করেছেন, এই বিষয়টি শুধু লন্ডন থেকে আসা মানুষের ক্ষেত্রে নয়—যে কেউ স্থানীয় সমাজের সঙ্গে যুক্ত হতে অনিচ্ছুক হলে একই পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

সব মিলিয়ে লন্ডনের কাছাকাছি থেকেও তুলনামূলক শান্ত পরিবেশ, সমৃদ্ধ ইতিহাস, সবুজ প্রকৃতি এবং ঘনিষ্ঠ সামাজিক জীবন—এই চারটি বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে উইনচেস্টার নিজেকে আলাদা করে তুলেছে। তবে এই আকর্ষণীয় জীবনযাত্রার মূল্যও কম নয়; বাড়ির দাম এখনো যথেষ্ট বেশি। তবু লন্ডনের কোলাহল থেকে দূরে থেকে শহুরে সুযোগ-সুবিধার পাশাপাশি গ্রামের মতো সামাজিক পরিবেশ চান—এমন মানুষের কাছে উইনচেস্টার একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠেছে।

সূত্রঃ মাই লন্ডন

এম.কে

Categories
বাংলাদেশ

ভিজিটর ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে যেসব কাজ করা যাবে নাঃ বাংলাদেশিদের সতর্ক করল মার্কিন দূতাবাস

ঢাকায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস যুক্তরাষ্ট্রের ভিজিটর ভিসা বি১/বি২ নিয়ে বাংলাদেশি নাগরিকদের সতর্ক করেছে। এই ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে কোন ধরনের কর্মকাণ্ড অনুমোদিত নয়, তা স্পষ্ট করে জানিয়েছে দূতাবাস।

শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টার দিকে ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের যাচাইকৃত ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে এসব তথ্য জানানো হয়। সেখানে বলা হয়েছে, বি১/বি২ ভিসা মূলত স্বল্পমেয়াদি ও নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণের জন্য ব্যবহৃত হয়। ভ্রমণকারীদের অবশ্যই ভিসার শর্ত মেনে চলতে হবে।

দূতাবাসের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, বি১/বি২ ভিসা ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সন্তান জন্ম দেওয়ার মাধ্যমে শিশুর জন্য মার্কিন নাগরিকত্ব পাওয়ার উদ্দেশ্যে ভ্রমণ করা অনুমোদিত নয়। অর্থাৎ নাগরিকত্ব পাওয়ার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সন্তান জন্ম দেওয়াকে ভিসার অনুমোদিত কার্যক্রম হিসেবে বিবেচনা করা হয় না।

এ ছাড়া এই ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রের কোনো নিয়োগকর্তা বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পারিশ্রমিক নিয়ে কাজ করাও নিষিদ্ধ। একইভাবে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে চাকরি বা অন্য কোনো ধরনের কাজ করার সুযোগ নেই।

মার্কিন দূতাবাস আরও জানিয়েছে, বি১/বি২ ভিসা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে ডিগ্রি অর্জন বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় একাডেমিক ক্রেডিট পাওয়ার উদ্দেশ্যে পড়াশোনা করাও অনুমোদিত নয়। এ ধরনের উদ্দেশ্যে ভ্রমণ করতে হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীকে উপযুক্ত শিক্ষার্থী ভিসা নিতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের বি১/বি২ হলো অস্থায়ী ভ্রমণের জন্য ব্যবহৃত ভিসা। এর মধ্যে বি১ সাধারণত ব্যবসায়িক কার্যক্রমের জন্য এবং বি২ পর্যটন, অবকাশযাপন বা চিকিৎসার মতো নির্দিষ্ট ভ্রমণ উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়। তাই ভিসার ধরন অনুযায়ী অনুমোদিত কর্মকাণ্ডের বাইরে গিয়ে কাজ করলে ভিসার শর্ত লঙ্ঘনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে অবৈধভাবে কাজ করা, পারিশ্রমিক গ্রহণ করা কিংবা ভিসার উদ্দেশ্যের বাইরে গিয়ে অবস্থান করার বিষয়ে ভ্রমণকারীদের সতর্ক থাকতে হবে। কারণ ভিসা থাকলেই যুক্তরাষ্ট্রে যেকোনো ধরনের কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি পাওয়া যায় না।

এর আগে গত ২২ আগস্ট বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদেরও সতর্ক করেছিল ঢাকার মার্কিন দূতাবাস। ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন শ্রেণির ভিসাধারীকে নিয়ম মেনে চলার বিষয়ে দূতাবাসের পক্ষ থেকে এসব সতর্কবার্তা দেওয়া হচ্ছে।

মার্কিন ভিসার ক্ষেত্রে তাই বাংলাদেশি আবেদনকারী ও ভ্রমণকারীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—যে উদ্দেশ্যে ভিসা নেওয়া হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানের সময় সেই উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কার্যক্রমেই সীমাবদ্ধ থাকা এবং ভিসার শর্ত ভঙ্গ না করা।

সূত্রঃ ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর

এম.কে

Categories
আন্তর্জাতিক

আফ্রিকা বড়, ইউরোপ-আমেরিকা ছোট—জাতিসংঘের নতুন মানচিত্রে ক্ষুব্ধ যুক্তরাষ্ট্র

দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত মানচিত্রে মহাদেশগুলোর আয়তন নিয়ে যে ভৌগোলিক বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে, তা সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে জাতিসংঘ। আফ্রিকাকে তুলনামূলক বড় এবং ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকাকে তুলনামূলক ছোট করে বিশ্বের স্থলভাগের বাস্তব আয়তন তুলে ধরতে একটি নতুন মানচিত্র ব্যবহারের পক্ষে প্রস্তাব পাস করেছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ। তবে সংস্থাটির এই উদ্যোগকে ভালোভাবে নেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। বরং ওয়াশিংটন প্রকাশ্যে এর সমালোচনা করেছে।

গত শুক্রবার সাধারণ পরিষদে উত্থাপিত প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দিয়েছে ১৬৪টি দেশ। বিপক্ষে ছিল যুক্তরাষ্ট্র এবং ছয়টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে। প্রস্তাবটিতে সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে ১৫৬৯ সালে ফ্ল্যান্ডার্সের মানচিত্রকার জেরার্ডাস মার্কেটরের তৈরি বহুল ব্যবহৃত মানচিত্রের পরিবর্তে সম-ক্ষেত্রফলভিত্তিক মানচিত্র ব্যবহারের আহ্বান জানানো হয়েছে।

এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের প্রকৃত আয়তনের পার্থক্যকে মানচিত্রে আরও বাস্তবসম্মতভাবে তুলে ধরা। কারণ বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত মার্কেটর প্রক্ষেপণে উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর দিকে থাকা ভূখণ্ডগুলোকে প্রকৃত আয়তনের তুলনায় অনেক বড় দেখায়। বিপরীতে বিষুবরেখার কাছাকাছি থাকা আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার মতো অঞ্চল তুলনামূলক ছোট দেখায়।

ষোড়শ শতকে সমুদ্রযাত্রার সময় দিকনির্ণয় সহজ করার জন্য মার্কেটর তার বিখ্যাত মানচিত্র তৈরি করেছিলেন। সে সময় নাবিকদের জন্য এটি ছিল অত্যন্ত কার্যকর একটি পদ্ধতি। কিন্তু গোলাকার পৃথিবীকে সমতল কাগজে উপস্থাপন করার কারণে মানচিত্রটিতে বিভিন্ন অঞ্চলের আকার ও আয়তনে অনিবার্য বিকৃতি তৈরি হয়।

এর সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ আফ্রিকা ও ইউরোপ। বাস্তবে আফ্রিকা মহাদেশ ইউরোপের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বড়। কিন্তু প্রচলিত মার্কেটর মানচিত্রে ইউরোপকে আফ্রিকার তুলনায় অনেক বেশি বড় দেখায়। একইভাবে গ্রিনল্যান্ডের মতো উত্তরাঞ্চলীয় ভূখণ্ডও তার প্রকৃত আয়তনের তুলনায় অস্বাভাবিক বড় বলে মনে হয়।

জাতিসংঘের প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন টোগোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট ডাসি। তিনি মনে করেন, মানচিত্রের মাধ্যমে পৃথিবীর একটি বিকৃত চিত্র দীর্ঘদিন ধরে মানুষের কাছে উপস্থাপিত হলে তা প্রজন্মের পর প্রজন্মের ভৌগোলিক ধারণাকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই বাস্তব আয়তনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মানচিত্র ব্যবহারের প্রয়োজন রয়েছে।

তবে এই অবস্থানের সঙ্গে একমত নয় যুক্তরাষ্ট্র। ভোটের আগে জাতিসংঘে মার্কিন প্রতিনিধি ইয়ারিনা ফেরেনসেভিচ প্রশ্ন তোলেন, বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ও বাস্তব সংকটের দিকে মনোযোগ না দিয়ে জাতিসংঘ কেন ষোড়শ শতকের একটি মানচিত্র নিয়ে বিতর্ক করছে। ওয়াশিংটনের মতে, এ ধরনের উদ্যোগ জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ কাজ থেকে মনোযোগ সরিয়ে দিচ্ছে এবং সংস্থাটির গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করছে।

মানচিত্র নিয়ে এই বিতর্ক অবশ্য শুধু ভূগোলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘদিন ধরে সমালোচকরা বলে আসছেন, প্রচলিত মানচিত্রে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার মতো উত্তর গোলার্ধের অঞ্চলগুলোকে বড় করে দেখানোর ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের ভৌগোলিক ধারণার ওপরও প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার প্রকৃত আয়তন সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা অনেক সময় বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।

তবে জাতিসংঘের এই উদ্যোগের অর্থ পৃথিবীর কোনো মহাদেশের প্রকৃত আয়তন বদলে যাচ্ছে না। আফ্রিকা আগের চেয়ে বড় কিংবা ইউরোপ আগের চেয়ে ছোট হয়ে যাচ্ছে—বিষয়টি এমন নয়। পরিবর্তনটি মূলত মানচিত্রে পৃথিবীর স্থলভাগকে কীভাবে উপস্থাপন করা হবে, সেই পদ্ধতিতে।

কারণ পৃথিবীর গোলাকার পৃষ্ঠকে সম্পূর্ণ নির্ভুলভাবে সমতল মানচিত্রে তুলে ধরা সম্ভব নয়। কোনো প্রক্ষেপণে আয়তন তুলনামূলকভাবে নির্ভুল রাখা যায়, আবার কোনো প্রক্ষেপণে দিক ও আকৃতি বেশি নির্ভুল থাকে। মার্কেটর প্রক্ষেপণের বড় সুবিধা ছিল দিকনির্ণয়, আর নতুন সম-ক্ষেত্রফলভিত্তিক পদ্ধতির প্রধান লক্ষ্য হলো বিভিন্ন ভূখণ্ডের আয়তনের আনুপাতিক সম্পর্ককে বাস্তবের কাছাকাছি রাখা।

ফলে জাতিসংঘের এই সিদ্ধান্ত মানচিত্রের একটি প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের পাশাপাশি বিশ্বকে কীভাবে দেখা ও উপস্থাপন করা হয়, সেই পুরোনো বিতর্ককেও সামনে নিয়ে এসেছে। একদিকে রয়েছে শত শত বছর ধরে ব্যবহৃত মার্কেটর মানচিত্রের ঐতিহ্য, অন্যদিকে বাস্তব আয়তনের তুলনামূলক নির্ভুল উপস্থাপনার দাবি। আর এই বিতর্কের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা জাতিসংঘের উদ্যোগটিকে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।

সূত্রঃ এপি\রয়টার্স

এম.কে