ব্রিটেনে বাংলাদেশি জনগোষ্ঠী একসময় অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে ব্যাপকভাবে পিছিয়ে থাকা একটি জনগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু নতুন প্রজন্মের শিক্ষাগত সাফল্য, কর্মসংস্থানে অংশগ্রহণ এবং পেশাগত অগ্রগতির কারণে সেই পুরোনো চিত্র ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট।
প্রতিবেদনটিতে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে বসবাসকারী প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার বাংলাদেশির সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এই জনগোষ্ঠীর ৯০ শতাংশেরও বেশি মুসলিম হওয়ায় এটিকে ব্রিটেনের মুসলিম জনগোষ্ঠীর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেও তুলে ধরা হয়েছে। দ্য ইকোনমিস্ট-এর বিশ্লেষণের মূল বক্তব্য হলো—বর্তমান পরিসংখ্যানের কিছু অংশ বাংলাদেশিদের এখনও পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী হিসেবে দেখালেও নতুন প্রজন্মের অগ্রগতি সেই সামগ্রিক চিত্রের চেয়ে অনেক বেশি ইতিবাচক।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্রিটেনে বাংলাদেশিদের বড় একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে পূর্ব লন্ডনে বসবাস করে আসছে। ১৯৮৭ সালে তৎকালীন প্রিন্স চার্লস স্পিটালফিল্ডস এলাকা পরিদর্শন করে সেখানে বাংলাদেশিদের জীবনযাত্রার অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। সে সময় বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও শিক্ষার হার নিয়ে সরকারি পর্যায়েও উদ্বেগ ছিল।
১৯৮৫ সালের একটি সরকারি প্রতিবেদনে বাংলাদেশি শিশুদের শিক্ষাগত অর্জনকে অত্যন্ত নিম্ন বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, অনেক শিশু গ্রামীণ বাংলাদেশ থেকে ব্রিটেনে এসে শিক্ষাব্যবস্থায় যুক্ত হয়েছিল এবং তাদের ইংরেজি ভাষাজ্ঞানও সীমিত ছিল। একই সময়ে বর্ণবাদী হামলার আশঙ্কা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতাও অনেক পরিবারের জীবনকে প্রভাবিত করেছিল।
তবে দ্য ইকোনমিস্ট-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বর্তমান প্রজন্মের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষাক্ষেত্রে বাংলাদেশি তরুণ-তরুণীদের অগ্রগতি সবচেয়ে স্পষ্ট।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১০-এর দশকের শুরুতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা জিসিএসই পরীক্ষায় শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ শিক্ষার্থীদের সমপর্যায়ে পৌঁছাতে শুরু করে। পরবর্তী সময়ে তাদের সাফল্য আরও বেড়েছে। ২০২১ সালে জিসিএসই দেওয়া বাংলাদেশিদের মধ্যে ৬৭ শতাংশ ১৯ বছর বয়সের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল, যেখানে শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৩৮ শতাংশ।
শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি নয়, বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের একটি ক্রমবর্ধমান অংশ প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে এবং ভবিষ্যতে ভালো কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারে—এমন বিষয় বেছে নিচ্ছে।
গত এক দশকে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইঞ্জিনিয়ারিং ও প্রযুক্তি বিষয়ে পড়াশোনার সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। একই সময়ে মেডিসিন ও ডেন্টিস্ট্রিতে পড়াশোনার সংখ্যা প্রায় তিনগুণ হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নারীদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। অতীতে বাংলাদেশি পরিবারের তুলনামূলক কম আয় ও অর্থনৈতিক দুর্বলতার অন্যতম কারণ হিসেবে নারীদের কম কর্মসংস্থানের কথা বলা হতো। কিন্তু ব্রিটেনে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশি নারীদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি পরিবর্তিত হচ্ছে।
২০২১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, ব্রিটেনে জন্ম নেওয়া ২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সী বাংলাদেশি নারীদের ৬৮ শতাংশ কর্মরত ছিলেন। একই বয়সী শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ নারীদের ক্ষেত্রে হার ছিল ৭৯ শতাংশ। তবে বাংলাদেশি অভিবাসী নারীদের কর্মসংস্থানের হার অনেক কম—এই বয়সসীমায় তা ছিল প্রায় ৩২ শতাংশ। অর্থাৎ ব্রিটেনে জন্ম নেওয়া প্রজন্ম এবং সদ্য অভিবাসী প্রজন্মের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে।
পেশাগত অবস্থানের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশিদের অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সী ব্রিটেনে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশিদের মধ্যে ১৪ শতাংশ পেশাগত বা ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের চাকরিতে ছিলেন। এই হার শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশদের প্রায় সমপর্যায়ের।
শিক্ষাক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণও বাড়ছে। ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষ থেকে ইংল্যান্ডের স্কুলগুলোতে বাংলাদেশি শিক্ষকের সংখ্যা প্রায় তিনগুণ হয়েছে বলে দ্য ইকোনমিস্ট উল্লেখ করেছে।
তবে অর্থনৈতিক অগ্রগতির পাশাপাশি বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর মধ্যে দারিদ্র্যের সমস্যাও এখনও রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আবাসন ব্যয় বাদ দেওয়ার পর প্রায় প্রতি দুই বাংলাদেশির একজন জাতীয়ভাবে সবচেয়ে নিম্ন আয়ের ২০ শতাংশ পরিবারের মধ্যে পড়ে। বাংলাদেশি পরিবারের মধ্যম সম্পদের পরিমাণও জাতীয় অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর তুলনায় অনেক কম।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, একটি বাংলাদেশি পরিবারের মধ্যম সম্পদের পরিমাণ ১ লাখ ডলারের কম, যেখানে সব জাতিগোষ্ঠী মিলিয়ে গড় সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৩ লাখ ডলার। বাংলাদেশিরা এখনও পূর্ব লন্ডনে তুলনামূলকভাবে বেশি কেন্দ্রীভূত। ফলে দারিদ্র্যের পুরোনো চিত্র পুরোপুরি অদৃশ্য হয়নি।
তবে দ্য ইকোনমিস্ট-এর বিশ্লেষণ বলছে, শুধু বর্তমান সম্পদ বা আয়ের পরিসংখ্যান দিয়ে বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তনকে পুরোপুরি বোঝা যায় না। কারণ এই জনগোষ্ঠীতে এখনও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নতুন অভিবাসী যুক্ত হচ্ছেন। ফলে সামগ্রিক পরিসংখ্যানের মধ্যে নতুন ও অপেক্ষাকৃত দরিদ্র অভিবাসীদের অন্তর্ভুক্তি পুরোনো প্রজন্মের অগ্রগতিকে আংশিকভাবে আড়াল করতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেক ব্রিটেনের বাইরে জন্মগ্রহণ করেছে। পুরো মুসলিম জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রেও বিদেশে জন্ম নেওয়া মানুষের অনুপাত প্রায় একই। ফলে বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীতে নতুন অভিবাসীদের প্রবেশ অব্যাহত থাকায় তাদের অর্থনৈতিক একীভূত হওয়ার অগ্রগতি পরিসংখ্যানে তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান নাও হতে পারে।
ব্রিটেনের অন্যান্য দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গেও বাংলাদেশিদের তুলনা করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানি জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ উত্তর ইংল্যান্ডের শিল্প-পরবর্তী শহরগুলোতে বসবাস করে। শিক্ষাক্ষেত্রে পাকিস্তানি তরুণরাও শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশদের ছাড়িয়ে গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশি ও পাকিস্তানি শিক্ষিত নারীদের সামাজিক ও পারিবারিক অবস্থানেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
জাতীয় অর্থনৈতিক ও সামাজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষক আনিসা বাটের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিক্ষিত বাংলাদেশি ও পাকিস্তানি নারীদের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা বিয়ের বাজারেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে—অর্থাৎ উচ্চতর যোগ্যতা তাদের সামাজিক আকর্ষণ বাড়াচ্ছে।
দ্য ইকোনমিস্ট ব্রিটেনে বাংলাদেশিদের অগ্রগতিকে পূর্ব আফ্রিকা থেকে ১৯৭০-এর দশকে বিতাড়িত এশীয় জনগোষ্ঠী এবং ২০০০-এর দশকে আসা পূর্ব ইউরোপীয় অভিবাসীদের অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে তুলনা করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোনো জনগোষ্ঠী যদি দ্রুত হারে অভিবাসন করে পরে অভিবাসনের গতি কমিয়ে দেয়, তাহলে তাদের অর্থনৈতিক অগ্রগতি তুলনামূলকভাবে দ্রুত দৃশ্যমান হয়।
বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে বিষয়টি কিছুটা ভিন্ন। কারণ পুরোনো প্রজন্মের পাশাপাশি নতুন অভিবাসীরাও নিয়মিত যুক্ত হচ্ছেন। ফলে সামগ্রিক জনগোষ্ঠীর পরিসংখ্যানে অগ্রগতির গতি তুলনামূলকভাবে কম দৃশ্যমান হতে পারে।
তবে প্রতিবেদনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শিক্ষাক্ষেত্রে সাফল্য, বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চহারে ভর্তি, পেশাগত চাকরিতে অংশগ্রহণ এবং নারীদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধির মাধ্যমে ব্রিটেনে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশি প্রজন্মের সামাজিক ও অর্থনৈতিক একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়া স্পষ্ট হচ্ছে।
সূত্রঃ দ্য ইকোনমিস্ট
এম.কে
লন্ডনের প্রায় ১২ লাখ বধির ও প্রতিবন্ধী মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, বৈষম্য কমানো এবং বিভিন্ন সরকারি ও সামাজিক সেবায় তাদের প্রবেশাধিকার বাড়াতে প্রথমবারের মতো একটি পূর্ণাঙ্গ কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ করেছে লন্ডন মেয়রের কার্যালয়। ১৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এই পরিকল্পনায় পরিবহন, নিরাপত্তা, আবাসন, কর্মসংস্থান এবং আর্থিক সহায়তার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য একাধিক বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনায় স্থানীয় কাউন্সিল ও আবাসন নির্মাতাদের পর্যাপ্তসংখ্যক প্রতিবন্ধীবান্ধব আবাসন নিশ্চিত করতে কাজ করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিবন্ধী লন্ডনবাসীরা যাতে তাদের প্রাপ্য আর্থিক সহায়তা সহজে দাবি করতে পারেন, অপরাধের ঘটনা জানাতে পারেন এবং জরুরি পরিস্থিতিতে নিরাপদে ভবন থেকে বের হতে পারেন, সেসব ক্ষেত্রেও ব্যবস্থা উন্নত করার কথা রয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা গবেষণা অনুযায়ী, যেসব পরিবারে অন্তত একজন প্রতিবন্ধী সদস্য রয়েছেন, সেসব পরিবারের দারিদ্র্যের হার গড়ে ৩১ শতাংশ। প্রতিবন্ধী সদস্য নেই—এমন পরিবারের তুলনায় এই হার প্রায় সাত শতাংশ পয়েন্ট বেশি। ২০২৪ সালে লন্ডনের প্রতিবন্ধী মানুষের মধ্যে ৫৯ শতাংশ কর্মরত ছিলেন। বিপরীতে প্রতিবন্ধী নন এমন মানুষের কর্মসংস্থানের হার ছিল ৮০ শতাংশ।
আবাসনের ক্ষেত্রেও বড় ব্যবধান রয়েছে। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ প্রতিবন্ধী লন্ডনবাসী সামাজিক আবাসনে বসবাস করেন। প্রতিবন্ধী নন এমন বাসিন্দাদের ক্ষেত্রে এই হার প্রায় ১০ শতাংশ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রয়োজন অনুযায়ী প্রবেশগম্য সামাজিক আবাসন না পাওয়ায় অনেক প্রতিবন্ধী মানুষকে বেসরকারি ভাড়া বাসায় থাকতে হয়, যার ফলে তাদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হয়।
প্রতিবন্ধী মানুষের প্রাপ্য আর্থিক সহায়তা পাওয়ার সুযোগ সহজ করতেও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রতিবেদনের জন্য মতামত দেওয়া কয়েকজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি জানিয়েছেন, যোগাযোগের বিভিন্ন বাধা এবং সহজে প্রবেশ করা যায় না—এমন স্থান তাদের প্রাপ্য সহায়তা পাওয়ার পথে বাধা তৈরি করেছে। এ কারণে গ্রেটার লন্ডন অথরিটি (জিএলএ) ‘অ্যাক্সেসিবল অ্যাডভাইস প্রভিশন’ বা প্রতিবন্ধীবান্ধব পরামর্শসেবা উন্নত করার একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ চালু করবে।
এর মাধ্যমে প্রতিবন্ধী লন্ডনবাসীরা তাদের প্রাপ্য আর্থিক সহায়তা সম্পর্কে আরও সহজে তথ্য পাওয়ার সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে ট্রান্সপোর্ট ফর লন্ডন (টিএফএল)-এর বিভিন্ন পরিবহন সেবায় প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য বিদ্যমান ছাড় ও সুবিধাগুলো সম্পর্কেও তাদের আরও সচেতন করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
পরিবহন ব্যবস্থায় প্রতিবন্ধী মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টিও পরিকল্পনায় গুরুত্ব পেয়েছে। তবে লন্ডনের ‘ফ্লোটিং বাস স্টপ’ নিয়ে চলমান উদ্বেগের বিষয়টি পরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়নি। এই ধরনের বাসস্টপে বাসযাত্রীদের ওঠানামার জায়গার সঙ্গে সাইকেল চলাচলের পথের সম্পর্ক থাকায় প্রতিবন্ধী ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ পথচারীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রচারকারীরা উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন।
জুলাই মাসে লন্ডন অ্যাসেম্বলিকে জিএলএ-এর কমিউনিটি ও সামাজিক নীতিবিষয়ক সহকারী পরিচালক টম রাহিলি জানিয়েছিলেন, কর্মপরিকল্পনা তৈরির সময় বিষয়টি আলোচনায় এসেছিল। প্রচারকারীরা ভবিষ্যতে লন্ডনে নতুন ফ্লোটিং বাস স্টপ তৈরির পরিকল্পনা বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছেন।
প্রতিবন্ধী মানুষের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ঘৃণাজনিত অপরাধও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে। মেট্রোপলিটন পুলিশ-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে লন্ডনে প্রতিবন্ধী মানুষকে লক্ষ্য করে ২ হাজার ২৪৫টি প্রতিবন্ধীবিরোধী ঘৃণাজনিত অপরাধের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে।
এ ধরনের অপরাধ সহজে রিপোর্ট করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা যাতে যথাযথ সহায়তা পান, তা নিশ্চিত করতে মেট্রোপলিটন পুলিশ মেয়র’স অফিস ফর পুলিশিং অ্যান্ড ক্রাইম (মোপ্যাক)-এর প্রতিবন্ধী সহ-উৎপাদন বা কো-প্রোডাকশন গ্রুপের সঙ্গে কাজ করবে। একই সঙ্গে জরুরি পরিস্থিতিতে প্রতিবন্ধী মানুষদের নিরাপদে ভবন থেকে বের করে আনার জন্য লন্ডন ফায়ার ব্রিগেড-এর সঙ্গে কাজ করে নিরাপদ বের হওয়ার পথ তৈরির প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।
সিটি হল জানিয়েছে, ভবিষ্যতের নীতিনির্ধারণে প্রতিবন্ধী মানুষের নিজস্ব অভিজ্ঞতাকে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে। এজন্য একজন ‘লিভড এক্সপেরিয়েন্স কো-চেয়ার’ নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি কমিউনিটি ও সামাজিক ন্যায়বিচারবিষয়ক ডেপুটি মেয়রের সঙ্গে কাজ করবেন।
জিএলএ আরও জানিয়েছে, কর্মপরিকল্পনার প্রতিটি পদক্ষেপের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে। প্রতিবন্ধী মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বিষয়ক ফোরামে প্রতি তিন মাসে অগ্রগতির তথ্য দেওয়া হবে এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য অনলাইনেও প্রকাশ করা হবে।
প্রতিবন্ধী অধিকার নিয়ে কাজ করা ইনক্লুশন লন্ডন-এর প্রধান নির্বাহী ট্রেসি ল্যাজার্ড কর্মপরিকল্পনাটিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, জিএলএ-এর সঙ্গে পরিকল্পনাটি তৈরির প্রক্রিয়ায় কৌশলগত অংশীদার হিসেবে কাজ করেছে তাদের সংগঠন এবং তারা এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
তবে তিনি জানান, প্রতিবন্ধী সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে দেওয়া সব প্রস্তাব প্রথম কর্মপরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি। এখন মূল গুরুত্ব দিতে হবে পরিকল্পনাটি পুরোপুরি বাস্তবায়নের ওপর এবং এতে নির্ধারিত লক্ষ্যগুলো যেন আগামী বছরগুলোতে লন্ডনের নীতিনির্ধারণে ব্যবহৃত হয় তা নিশ্চিত করার ওপর।
কর্মপরিকল্পনার ভূমিকায় লন্ডনের মেয়র বলেন, রাজধানীতে প্রায় ১২ লাখ বধির ও প্রতিবন্ধী মানুষ বসবাস করেন এবং তারা লন্ডনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। তবে অনেক প্রতিবন্ধী মানুষ এখনো এমন বৈষম্য ও সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন, যা তাদের দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করছে এবং লন্ডনের জীবন ও সুযোগ-সুবিধায় পূর্ণাঙ্গ অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টি করছে।
মেয়র বলেন, এসব বাধা দূর করা এবং বধির ও প্রতিবন্ধী মানুষের জীবনমান উন্নত করার লক্ষ্যেই কর্মপরিকল্পনাটি চালু করা হয়েছে। তিনি পরিকল্পনাটিকে শুধু একটি নীতিগত ঘোষণা হিসেবে নয়, বরং বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি হিসেবে উল্লেখ করেন।
তবে লন্ডন অ্যাসেম্বলিতে লিবারেল ডেমোক্র্যাটদের নেতা হিনা বুখারি পরিকল্পনাটির উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও বিনিয়োগ নিয়ে সমালোচনা করেছেন। তার মতে, প্রতিবন্ধী লন্ডনবাসীদের মুখোমুখি হওয়া কাঠামোগত বাধা দূর করতে আরও বড় পরিসরের পরিবর্তন ও বিনিয়োগ প্রয়োজন।
পরিকল্পনাটি প্রথমে মার্চে প্রকাশের কথা থাকলেও পরে জুন এবং শেষ পর্যন্ত ১৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশ করা হয়। পরিকল্পনা প্রকাশের অনুষ্ঠানে মেয়র নিজে উপস্থিত ছিলেন না। তার পরিবর্তে কমিউনিটি ও সামাজিক ন্যায়বিচারবিষয়ক ডেপুটি মেয়র অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
নতুন কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে লন্ডনে প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য পরিবহন, আবাসন, কর্মসংস্থান, আর্থিক সহায়তা, নিরাপত্তা এবং সরকারি সেবায় প্রবেশাধিকার উন্নত করার জন্য একাধিক পদক্ষেপ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
সূত্রঃ মাই লন্ডন
এম.কে
যুক্তরাজ্যে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি বা ইনডেফিনিট লিভ টু রিমেইন (আইএলআর) পাওয়ার নিয়ম কঠোর করার প্রস্তাব নিয়ে প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের সরকারের ওপর রাজনৈতিক ও ট্রেড ইউনিয়ন পর্যায়ে চাপ বাড়ছে। প্রস্তাবিত পরিবর্তনে সাধারণ বিদেশি কর্মীদের আইএলআর পাওয়ার সময়সীমা পাঁচ বছর থেকে বাড়িয়ে ১০ বছর এবং হেলথ অ্যান্ড কেয়ার ওয়ার্কার ভিসায় থাকা কর্মীদের ক্ষেত্রে তা ১৫ বছর করার প্রস্তাব রয়েছে।
ব্রাইটনে অনুষ্ঠিত ট্রেডস ইউনিয়ন কংগ্রেসের বার্ষিক সম্মেলনে প্রতিনিধিরা সর্বসম্মতভাবে এমন নীতির বিরোধিতা করে প্রস্তাব পাস করেছেন, যা বর্তমানে যুক্তরাজ্যে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের ওপর নতুন বসবাসের শর্ত পেছন থেকে প্রয়োগ করতে পারে।
ট্রেড ইউনিয়নগুলোর দাবি, আন্তর্জাতিক কর্মীরা যখন সরকারের আহ্বানে সাড়া দিয়ে যুক্তরাজ্যে এসেছেন, তখন তাদের জন্য যে নিয়ম ও প্রত্যাশা ছিল, মাঝপথে তা পরিবর্তন করা উচিত নয়। বিশেষ করে এনএইচএস ও সামাজিক সেবা খাতে বিদেশি কর্মীদের অবদান বিবেচনায় নিয়ে বর্তমান কর্মীদের অধিকার ও ভবিষ্যৎ নিয়ে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রস্তাবিত আইএলআর সংস্কারটি মূলত সাবেক প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমারের সরকারের সময় তৈরি করা হয়েছিল। পরবর্তীতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী শাবানা মাহমুদও এই কাঠামোকে সমর্থন করেন।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে কর্মরত অধিকাংশ বিদেশি নাগরিকের স্থায়ী বসবাসের যোগ্যতার সাধারণ সময়সীমা পাঁচ বছর থেকে বাড়িয়ে ১০ বছর করা হতে পারে। হেলথ অ্যান্ড কেয়ার ওয়ার্কার ভিসার ক্ষেত্রে সময়সীমা ১৫ বছর পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে।
এছাড়া যারা ১২ মাসের বেশি সময় সরকারি সুবিধা বা রাষ্ট্রীয় সহায়তা গ্রহণ করবেন, তাদের ক্ষেত্রে আইএলআর পাওয়ার সময়সীমা ২০ বছর পর্যন্ত হতে পারে বলে প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই প্রস্তাব নিয়ে সরকারের পরামর্শ প্রক্রিয়ায় ২ লাখের বেশি আনুষ্ঠানিক মতামত জমা পড়েছে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী শাবানা মাহমুদ যুক্তি দিয়েছেন, মহামারির পর যুক্তরাজ্যে নেট অভিবাসন নজিরবিহীন মাত্রায় পৌঁছেছে এবং সীমান্ত ও অভিবাসন ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য কঠোর আইনগত পদক্ষেপ প্রয়োজন।
তবে ট্রেড ইউনিয়নগুলোর অবস্থান ভিন্ন। তাদের বক্তব্য, বর্তমানে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বিদেশি কর্মীদের ক্ষেত্রে নিয়ম পরিবর্তন করা হলে তারা এমন একটি নীতির মুখোমুখি হবেন, যা ব্রিটেনে আসার সময় তাদের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।
ইউনিসন—ব্রিটেনের অন্যতম বৃহৎ পাবলিক সার্ভিস ট্রেড ইউনিয়ন—এই নীতির বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। ইউনিয়নটি স্থানীয় সরকার ও স্বাস্থ্য খাতের বিপুলসংখ্যক কর্মীর প্রতিনিধিত্ব করে।
ইউনিয়নের বক্তব্য অনুযায়ী, এনএইচএস ও আবাসিক কেয়ার খাতে যখন তীব্র কর্মী সংকট ছিল, তখন সরকার নিজেই বিদেশ থেকে কর্মী নিয়োগে উৎসাহ দিয়েছিল। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে বহু আন্তর্জাতিক কর্মী যুক্তরাজ্যে এসে স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা খাতে কাজ শুরু করেছেন।
ট্রেড ইউনিয়ন প্রতিনিধিরা মনে করেন, এই কর্মীরা যে শর্তের ভিত্তিতে যুক্তরাজ্যে এসেছেন, তাদের কর্মজীবনের মাঝপথে সেই শর্ত পরিবর্তন করা হলে তা কর্মীদের সঙ্গে রাষ্ট্রের পারস্পরিক আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
স্বাস্থ্য খাতের পেশাজীবী সংগঠনগুলোও এই উদ্বেগের সঙ্গে একমত হয়েছে। সম্মেলনে সোসাইটি অব রেডিওগ্রাফার্স প্রস্তাবটির সমর্থনে অবস্থান নেয়।
সংস্থাটির খাতভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক রেডিওগ্রাফারের সংখ্যা ১২ শতাংশ কমেছে এবং জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে ১,৫০০-এর বেশি যোগ্যতাসম্পন্ন পেশাজীবী হারানোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
ক্লিনিক্যাল পেশাজীবী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে আরও সতর্ক করা হয়েছে, স্থায়ীভাবে বসবাসের পথ অনিশ্চিত হয়ে উঠলে দক্ষ আন্তর্জাতিক কর্মীরা যুক্তরাজ্যের পরিবর্তে কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এসব দেশের স্থায়ী বসবাসের পথ তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট ও স্থিতিশীল বলে সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে উল্লেখ করা হয়েছে।
আইএলআর নীতি নিয়ে সরকারের অবস্থান নিয়ে লেবার পার্টির ভেতরেও অতীতের বক্তব্য ঘিরে আলোচনা তৈরি হয়েছে। হাউজিং মন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা রেনার এর আগে প্রস্তাবিত মেয়াদ বৃদ্ধির সমালোচনা করেছিলেন।
অ্যাঞ্জেলা রেনার, প্রাথমিক প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার সময় স্থায়ী বসবাসের শর্ত পরিবর্তনকে ‘আন-ব্রিটিশ’ বলে বর্ণনা করেছিলেন। তার বক্তব্য ছিল, বসবাসের শর্ত পরিবর্তনের বিষয়টি ন্যায়বিচারের ব্রিটিশ মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন।
অ্যান্ডি বার্নহ্যাম সরকারপ্রধান হওয়ার আগে রেনারের উদ্বেগের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেছিলেন এবং দলীয় নেতৃত্বের উচিত তার বক্তব্য গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা বলে মন্তব্য করেছিলেন।
এখন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বার্নহ্যামের সামনে একাধিক রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে। একদিকে সরকার অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় কঠোর অবস্থান নিতে চাইছে; অন্যদিকে ট্রেড ইউনিয়নগুলো এনএইচএস, কেয়ার খাত এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সেবায় কর্মরত আন্তর্জাতিক কর্মীদের স্থায়ী বসবাসের পথ অনিশ্চিত না করার দাবি জানাচ্ছে।
লেবার পার্টির কয়েকজন ব্যাকবেঞ্চ এমপিও ইঙ্গিত দিয়েছেন, প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলো সেকেন্ডারি লেজিসলেশনের মাধ্যমে কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হলে তারা এর বিরোধিতা করতে পারেন।
ট্রেড ইউনিয়নগুলোর মূল দাবি হলো—বর্তমানে যুক্তরাজ্যে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের ওপর নতুন আইএলআর নিয়ম পেছন থেকে প্রয়োগ না করা এবং যারা সরকারের আন্তর্জাতিক নিয়োগ কর্মসূচিতে সাড়া দিয়ে ইতোমধ্যে দেশের গুরুত্বপূর্ণ খাতে কাজ করছেন, তাদের জন্য পূর্বের প্রত্যাশিত বসবাসের পথ বজায় রাখা।
আইএলআর নীতি নিয়ে সরকারের পরবর্তী সিদ্ধান্ত তাই শুধু অভিবাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন নয়, একই সঙ্গে এনএইচএস ও সামাজিক সেবা খাতে কর্মরত আন্তর্জাতিক কর্মীদের ভবিষ্যৎ এবং লেবার সরকার ও ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের সম্পর্কের ওপরও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের আগে পরামর্শ প্রক্রিয়ায় পাওয়া ২ লাখের বেশি মতামত পর্যালোচনা করা হবে। এরপর প্রস্তাবিত আইএলআর সংস্কার কোন পথে এগোবে, সেটিই এখন নজরে রয়েছে।
সূত্রঃ দ্য ড্যাজলিং ডন
এম.কে
যুক্তরাজ্যের হিথরো বিমানবন্দরের তৃতীয় রানওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিম লন্ডনে নতুন করে তীব্র বিরোধিতা দেখা দিয়েছে। পূর্ব টুইকেনহামের বাসিন্দাদের আশঙ্কা, বিমানবন্দর সম্প্রসারণ হলে তাদের ওপর দিয়ে আরও বেশি বিমান চলাচল করবে এবং এর ফলে শব্দদূষণ, বায়ুদূষণ ও যানজটের মাত্রা বাড়তে পারে।
হিথরো এয়ারপোর্ট লিমিটেড উত্তর-পশ্চিম দিকে নতুন একটি ৩,৫০০ মিটার দীর্ঘ রানওয়ে নির্মাণের প্রস্তাব নিয়ে এগোচ্ছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করতে হলে এম২৫ মোটরওয়ের একটি অংশের অবস্থান পরিবর্তন করতে হবে।
প্রস্তাবিত সম্প্রসারণের বিষয়ে সরকারের ড্রাফট হিথরো এক্সপ্যানশন ন্যাশনাল পলিসি স্টেটমেন্ট (HENPS) বর্তমানে মতামত ও প্রতিক্রিয়া পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। সম্প্রসারণের অনুমোদনের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অবদান, জলবায়ু সংক্রান্ত আইনগত বাধ্যবাধকতা, বায়ুর মান এবং শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ—এই চারটি বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে রাখা হয়েছে।
তবে স্থানীয় কাউন্সিল ও এমপিদের একাংশের অভিযোগ, প্রস্তাবিত ব্যবস্থাগুলো হিথরো সম্প্রসারণের ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের ওপর সম্ভাব্য বাড়তি শব্দদূষণ, বায়ুদূষণ ও যানজট থেকে যথেষ্ট সুরক্ষা দেবে না।
পূর্ব টুইকেনহাম হিথরোর গুরুত্বপূর্ণ বিমান চলাচলের পথের নিচে অবস্থিত। বিমান পূর্বদিকে উড্ডয়ন করার সময় এলাকাটির বাসিন্দারা বিমানজনিত শব্দের প্রভাব অনুভব করেন। স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা স্থানীয় গণতন্ত্র প্রতিবেদকদের জানিয়েছেন, এই পরিস্থিতিতে তৃতীয় রানওয়ে নির্মাণ তাদের কাছে অযৌক্তিক মনে হচ্ছে।
পূর্ব টুইকেনহামে অ্যান্ড মোর স্টোর পরিচালনাকারী ৫১ বছর বয়সী জানিস মেডনিস বলেন, সম্প্রসারণের ফলে স্থানীয়দের জীবনে আরও শব্দ ও দূষণ যুক্ত হবে। তার আশঙ্কা, এর প্রভাবে এলাকার সম্পত্তির দামও কমে যেতে পারে। তবে তিনি স্বীকার করেন, বিমানবন্দর সম্প্রসারণ অর্থনীতির জন্য সুবিধা তৈরি করতে পারে।
হিথরোর সর্বশেষ জনমত জরিপের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে পরিচালিত জরিপে টুইকেনহামের ৫৭ শতাংশ বাসিন্দা বিমানবন্দর সম্প্রসারণের পক্ষে মত দিয়েছেন বলে হিথরো জানিয়েছে।
তবে পূর্ব টুইকেনহামের বাসিন্দা ডগলাস ও ক্লেয়ার প্রস্তাবিত সম্প্রসারণের বিরোধিতা করেছেন। তাদের মতে, হিথরোর তুলনায় কম ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত গ্যাটউইক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ করা বেশি যৌক্তিক হতে পারে। বিশেষ করে নতুন বিমান চলাচলের পথ কীভাবে নির্ধারিত হবে এবং তার ফলে স্থানীয়দের ওপর শব্দের প্রভাব কতটা বাড়বে, তা এখনও স্পষ্ট নয় বলে তারা উল্লেখ করেন।
গ্যাটউইক বিমানবন্দরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে সেখানে সম্প্রসারণের অনুমতি দেওয়া হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, উত্তর রানওয়ের অবস্থান পরিবর্তন করে সেটিকে নিয়মিতভাবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করা হবে। বর্তমানে উত্তর রানওয়েটি মূল রানওয়ে ব্যবহারের অনুপযোগী হলে জরুরি রানওয়ে হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
ইস্ট টুইকেনহাম হিথরো ক্যাম্পেইনের সদস্য ফিলিপ জেফরি দাবি করেছেন, হিথরোর প্রস্তাবিত সম্প্রসারণ HENPS-এ নির্ধারিত শর্ত পূরণ করছে না। তিনি পরিকল্পনাটিকে “বায়ুর মান ও পরিবেশের জন্য বিপর্যয়” হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ফিলিপ জেফরির বক্তব্য অনুযায়ী, সম্প্রসারণ হলে শব্দদূষণ ও বায়ুর মানের অবনতির কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনযাত্রার মান কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তার দাবি, এর প্রভাব শুধু পূর্ব টুইকেনহামেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; লন্ডনের আরও বিস্তৃত এলাকায় বায়ুর মানের ওপর প্রভাব পড়তে পারে।
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, গত কয়েক বছরে লন্ডনে বায়ুর মান উন্নয়নের ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি হয়েছে, আকাশে আরও বেশি বিমান চলাচল করলে সেই অগ্রগতি নষ্ট হওয়ার গুরুতর ঝুঁকি রয়েছে।
টুইকেনহামের এমপি মুনিরা উইলসন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামকে পাঠানো এক চিঠিতে হিথরো সম্প্রসারণের অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তার দাবি, সরকারের আগের হিসাব অনুযায়ী সম্প্রসারণের ফলে যুক্তরাজ্যের জিডিপি ০.৪৩ শতাংশ বাড়ার পূর্বাভাস থাকলেও HENPS-এ সেই পূর্বাভাস কমিয়ে ০.০৫ শতাংশ করা হয়েছে।
মুনিরা উইলসনের দাবি, সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বড় অংশ লন্ডন ও দক্ষিণ-পূর্ব ইংল্যান্ডে কেন্দ্রীভূত হতে পারে এবং এর ফলে দেশের অন্যান্য আঞ্চলিক অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, HENPS-এর সঙ্গে থাকা টেকসই উন্নয়ন মূল্যায়নে হিথরো সম্প্রসারণের ফলে সামাজিক, পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাবের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে তিনি সরকারকে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে স্থানীয় সব বাসিন্দা যে সম্প্রসারণের বিরোধিতা করছেন, তা নয়। পূর্ব টুইকেনহামে ১৩ বছর ধরে বসবাসকারী ৭৯ বছর বয়সী রড পিল বলেছেন, হিথরো সম্প্রসারণ পুরো দেশের জন্য সুবিধা বয়ে আনতে পারে। তিনি এই পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বিগ্ন নন।
রিচমন্ড কাউন্সিল দীর্ঘদিন ধরে হিথরোর সম্প্রসারণের বিরোধিতা করে আসছে। সম্প্রতি রিচমন্ড, ওয়ান্ডসওয়ার্থ, কিংস্টন, হিলিংডন, সাউথওয়ার্ক, সাটন এবং উইন্ডসর অ্যান্ড মেইডেনহেড কাউন্সিলের নেতারা যৌথভাবে তৃতীয় রানওয়ের বিরোধিতা পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
পরিবহনমন্ত্রী হেইডি আলেকজান্ডারকে পাঠানো চিঠিতে কাউন্সিল নেতারা বলেছেন, লন্ডনবাসী ও আশপাশের সম্প্রদায়ের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব যখন এখনও এত গভীর এবং অমীমাংসিত, তখন তৃতীয় রানওয়ে প্রয়োজনীয় বা গ্রহণযোগ্য—এমন অবস্থান তারা মেনে নেন না।
কাউন্সিল নেতারা বিকল্প ব্যবস্থাগুলো বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে বিদ্যমান বিমানবন্দর সক্ষমতার আরও কার্যকর ব্যবহার, উন্নত রেল যোগাযোগ এবং অভ্যন্তরীণ বিমানযাত্রার পরিবর্তে রেলপথ ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া।
অন্যদিকে হিথরো কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, স্থানীয় সম্প্রদায়ের উদ্বেগকে তারা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে এবং বাসিন্দাদের সঙ্গে উন্মুক্ত ও গঠনমূলক আলোচনা চালিয়ে যেতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
হিথরোর বক্তব্য অনুযায়ী, সম্প্রসারণ কেবল তখনই বাস্তবায়ন করা হবে যখন শব্দদূষণ, বায়ুর মান ও কার্বন নিঃসরণ নিয়ে আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক লক্ষ্য পূরণ করা সম্ভব হবে। প্রতিষ্ঠানটি আরও দাবি করেছে, বিমান চলাচলের শব্দের আওতাধীন এলাকা কমানো এবং অপেক্ষাকৃত কম শব্দ ও কম দূষণকারী বিমান ব্যবহারে এয়ারলাইনগুলোকে উৎসাহিত করার ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে অগ্রগতি হয়েছে।
হিথরো আরও বলেছে, তাদের সাম্প্রতিক জনমত জরিপে স্থানীয় বাসিন্দাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ সম্প্রসারণের পক্ষে রয়েছে। তাদের মতে, এই প্রকল্পের মাধ্যমে হাজারো কর্মসংস্থান এবং স্থানীয় ব্যবসার জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
হিথরো কর্তৃপক্ষ চলতি বছরের শেষ দিকে তৃতীয় সম্প্রসারণ-সংক্রান্ত নতুন জনপরামর্শ শুরু করার কথা জানিয়েছে। সেখানে স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের মতামত জানানোর সুযোগ পাবেন।
সরকার জনপরামর্শের প্রতিক্রিয়া পর্যালোচনা করে হিথরো সম্প্রসারণ নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে বছরের শেষ নাগাদ HENPS নিয়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ভোট হতে পারে বলে তথ্যমতে জানা যায়।
সূত্রঃ মাই লন্ডন
এম.কে
লন্ডনে শিশুদের একটি অংশ ভয়াবহভাবে জড়িয়ে পড়ছে ব্রিটেনের ‘কাউন্টি লাইনস’ মাদক বাণিজ্যে। সংগঠিত অপরাধী চক্রগুলো শিশুদের বন্ধুত্ব, অর্থ ও সামাজিক মর্যাদার প্রলোভন দেখিয়ে নিজেদের নেটওয়ার্কে ঢোকানোর পর ভয়ভীতি, সহিংসতা ও জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মাদক, নগদ অর্থ ও অস্ত্র পরিবহনে ব্যবহার করছে। দ্য লন্ডন স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে ক্র্যাক কোকেন ও হেরোইন সরবরাহের মাধ্যমে কাউন্টি লাইনস অপরাধব্যবস্থা বছরে সর্বোচ্চ ৫০ কোটি পাউন্ড আয় করছে।
প্রতিবেদনে ১৪ বছর বয়সী ‘ক্যাসপার’ নামের এক শিশুর ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। লন্ডন থেকে তাকে পাচার করে একটি ‘ট্র্যাপ হাউসে’ আটকে রাখা হয়। সেখানে তাকে হেরোইন ও ক্র্যাক কোকেন পরিবহন ও বিক্রি করতে বাধ্য করা হয়। একাধিকবার নতুন জায়গায় নেওয়ার সময় পুলিশের নজর এড়াতে তার শরীরের ভেতরে মাদক লুকিয়ে রাখতে বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ। তাকে নিয়মিত মারধর করা হতো এবং পালানোর চেষ্টা করলে তার মাথায় বন্দুক ঠেকানো হতো। তার পরিবারের লন্ডনের বাড়িতেও বারবার ভাঙচুর চালানো হয়।
কাউন্টি লাইনসের কার্যক্রম এখন শুধু এক শহর থেকে অন্য শহরে মাদক সরবরাহের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিশুদের অপরাধমূলক শোষণ, দুর্বল ব্যক্তিদের বাড়ি দখল করে মাদক রাখার ঘাঁটি তৈরি, অর্থপাচার এবং কৃত্রিম ঋণের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের মতো অপরাধ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১১ বছর বয়সী শিশুকেও মাদক, নগদ অর্থ ও অস্ত্র পরিবহনে ব্যবহার করা হচ্ছে।
ইয়ুথ এনডাওমেন্ট ফান্ডের হিসাবে, ব্রিটেনে ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সী প্রতি আটজন শিশুর একজনকে মাদক বিক্রি বা পরিবহনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। লন্ডনের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে ৪ হাজারের বেশি শিশু কাউন্টি লাইনস কার্যক্রমে প্রলুব্ধ বা জোরপূর্বক যুক্ত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সেন্ট জাইলস ট্রাস্টের সহযোগী পরিচালক জুনিয়র স্মার্ট বলেন, অপরাধী চক্রগুলো শিশুদের লক্ষ্য করে কারণ তাদের প্রভাবিত, ভয় দেখানো, বিচ্ছিন্ন ও নিয়ন্ত্রণ করা তুলনামূলক সহজ। শুরুতে সামান্য অর্থ, দামি জুতা-পোশাক, খাবার কিংবা বন্ধুত্বের মাধ্যমে তাদের কাছে টানা হয়। লন্ডনের দরিদ্র কিছু এলাকায় এমনকি এক বালতি ভাজা মুরগি দিয়েও শিশুদের প্রলুব্ধ করার ঘটনা সামনে এসেছে।
প্রলোভনের পর শুরু হয় শোষণের কঠিন ধাপ। শিশুদের অস্ত্র বহন, প্রতিদ্বন্দ্বী গ্যাংয়ের সদস্যদের ওপর হামলা এবং নতুন শহরে মাদক সরবরাহের লাইন তৈরি করার মতো কাজে পাঠানো হয়। প্রতিবেদনে এমন একটি ঘটনার উল্লেখ রয়েছে, যেখানে ১৪ বছর বয়সী এক ছেলেকে গ্যাংয়ে দীক্ষার অংশ হিসেবে একটি মেয়েকে ধর্ষণ করতে বাধ্য করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
ক্যাসপারের ক্ষেত্রে স্কুল থেকে বহিষ্কারও বড় ঝুঁকি তৈরি করে। ১২ বছর বয়সে স্কুল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর সে দীর্ঘ সময় শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। তার মা দীর্ঘ সময় কাজ করতেন এবং পরিবারে আর্থিক সংকট ছিল। এতগুলো সতর্কতামূলক লক্ষণ থাকা সত্ত্বেও সামাজিক সেবা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
আরেক কিশোর ‘ইওয়ান’-এর ক্ষেত্রেও ছিল দীর্ঘদিনের অনুপস্থিতি, পারিবারিক অস্থিরতা, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা এবং মাদক ব্যবহার। মাত্র ১০ বছর বয়সে সে গাঁজা ব্যবহার শুরু করে এবং ১২ বছর বয়সে নিজের মাদক ব্যবহারের অর্থ জোগাড় করতে কাউন্টি লাইনসের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। পরে তার মাদক ব্যবহার বেড়ে যায় এবং সে বারবার নিখোঁজ হতে থাকে।
ব্ল্যাক বক্স রিসার্চ অ্যান্ড কনসালটেন্সির প্রতিষ্ঠাতা ড. গ্রেস রবিনসন বলেন, তাদের সঙ্গে কাজ করা শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের বড় একটি অংশের স্কুল থেকে বহিষ্কার অথবা দীর্ঘমেয়াদি অনুপস্থিতির ইতিহাস রয়েছে। তার মতে, স্কুল অনেক শিশুর জীবনে গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষামূলক পরিবেশ তৈরি করে। স্কুল থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর অপরাধী চক্রগুলোর জন্য ওই শিশুদের কাছে পৌঁছানো সহজ হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, অনেক বহিষ্কৃত শিক্ষার্থীকে পিউপিল রেফারাল ইউনিটে পাঠানো হয়। এসব প্রতিষ্ঠানে কম সময়ের ক্লাসসূচির কারণে কিছু শিশু দিনের একটি বড় অংশ তত্ত্বাবধানহীন থাকে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্কুল ফাঁকি, মাদক রাখা বা অস্ত্র বহনের মতো আচরণ অনেক সময় শুধু শৃঙ্খলাভঙ্গ নয়; এগুলো কোনো শিশু ইতোমধ্যে অপরাধমূলক শোষণের শিকার হওয়ার লক্ষণও হতে পারে।
ক্যাসপারকে তার বাড়ি থেকে প্রায় ১০০ মাইল দূরে পুলিশ খুঁজে পেলেও তাকে ন্যাশনাল রেফারাল মেকানিজম বা এনআরএমে রেফার করা হয়নি। মর্ডান স্লেভারি আইনের আওতায় কোনো শিশুকে পাচার বা শোষণের শিকার হওয়ার যৌক্তিক সন্দেহ থাকলে পুলিশ ও অন্যান্য সরকারি কর্তৃপক্ষের তাকে এনআরএমে রেফার করার আইনি দায়িত্ব রয়েছে।
আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট কর্মীদের অভিযোগ, কাউন্টি লাইনসের শিকার অনেক শিশুকেই ভুক্তভোগী হিসেবে না দেখে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাদের নীরবতা, অসংলগ্ন বক্তব্য কিংবা বারবার গ্যাংয়ের কাছে ফিরে যাওয়াকে কখনো অপরাধমূলক উদ্দেশ্যের প্রমাণ হিসেবে দেখা হয়। অথচ এগুলো জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণ ও মানসিক আঘাতের ফলও হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি শিশুকে কাউন্টি লাইনস থেকে বের করে আনতে শুধু পুলিশি অভিযান যথেষ্ট নয়। দীর্ঘমেয়াদি, আস্থাভিত্তিক ও মানসিক আঘাত বিবেচনায় নেওয়া সহায়তা প্রয়োজন। ইওয়ানের ক্ষেত্রে সেন্ট জাইলস তার অটিজম, মানসিক স্বাস্থ্য এবং অতীতের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে ধীরে ধীরে তার সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা করে।
মেট্রোপলিটন পুলিশ লন্ডনে নিয়মিত মাদক সরবরাহের লাইন বন্ধ করছে। তবে প্রতিবেদনে স্কুলে অনুপস্থিতি পর্যবেক্ষণ, যুব সেবা, সামাজিক সহায়তা এবং কাউন্সিলগুলোর আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ তুলে ধরা হয়েছে। সাম্প্রতিক ক্রাইম অ্যান্ড পুলিশিং অ্যাক্ট শিশুদের অপরাধমূলক শোষণসংক্রান্ত অপরাধ আরও শক্তিশালী করলেও বিশেষজ্ঞদের একাংশ পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর শোষণের লক্ষণ শনাক্ত করার প্রশিক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
ড. রবিনসনের মতে, খুব কম ঘটনাই পূর্ণাঙ্গ তদন্তের পর্যায়ে পৌঁছায়। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা শিশুদের শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার আগেই শোষণের লক্ষণ শনাক্ত করা, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে তথ্য বিনিময় বাড়ানো, যুব ও সামাজিক সহায়তা শক্তিশালী করা এবং অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার পরিবর্তে শিশু সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
সূত্রঃ দ্য লন্ডন স্ট্যান্ডার্ড
এম.কে
বন্দি প্রেমিকের জন্য কারাগারে মাদক ও অন্যান্য নিষিদ্ধ সামগ্রী পাচারের দায়ে ব্রিটেনে ৬১ বছর বয়সী এক ফার্মেসি টেকনিশিয়ানকে ছয় বছর তিন মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
দণ্ডপ্রাপ্ত নারীর নাম তানিয়া পেট্রি। তিনি নর্থ সমারসেটের ওয়ার্ল এলাকার বাসিন্দা এবং ব্রিস্টলের এইচএমপি ব্রিস্টল কারাগারে অক্সলিয়াস এনএইচএস ফাউন্ডেশন ট্রাস্টের হয়ে কাজ করতেন।
আদালতে বলা হয়, কারাগারে কর্মরত অবস্থায় পেট্রির এক বন্দির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের মাধ্যমে ওই বন্দি প্রথম তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে তাদের কথাবার্তা ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে পরিণত হয়।
২০২৩ সালের অক্টোবরে পুলিশ পেট্রিকে কারাগারের কাছাকাছি একটি ময়লার বিন থেকে একটি প্যাকেট সংগ্রহ করতে দেখতে পায়। সকাল সাড়ে ৬টার দিকে তিনি ওই প্যাকেটটি সংগ্রহ করেন। পুলিশের ধারণা ছিল, প্যাকেটটি তার কারাগারে থাকা প্রেমিক বন্দির কাছে পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল।
প্যাকেটের ভেতরে প্রায় দুই আউন্স উচ্চমাত্রায় বিশুদ্ধ কোকেন, ৭৭ গ্রাম ‘স্পাইস’ পেস্ট এবং তামাক পাওয়া যায়। ‘স্পাইস’ হলো কৃত্রিম একটি মাদক, যা গাঁজার মতো প্রভাব সৃষ্টি করার জন্য তৈরি করা হয়।
ওই দিন সকাল আনুমানিক ৮টার দিকে কারাগারে নিষিদ্ধ সামগ্রী নেওয়ার সন্দেহে পেট্রিকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে পেট্রি স্বীকার করেন, প্যাকেটটি সংগ্রহ করার বিনিময়ে তাকে ৮০০ পাউন্ড দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। ময়লার বিনের ভেতরে ওই অর্থ রাখা হয়েছিল।
তিনি আরও স্বীকার করেন, এর আগে ২ হাজার পাউন্ডের বিনিময়ে সাতটি সিম কার্ড কারাগারের ভেতরে নিয়ে গিয়েছিলেন।
এই ঘটনায় ব্রিস্টল ক্রাউন কোর্টে পেট্রির বিরুদ্ধে দুটি পৃথক অভিযোগে দোষ প্রমাণিত হয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে কারাগারের ভেতরে বা বাইরে ‘লিস্ট বি’ শ্রেণির নিষিদ্ধ সামগ্রী বহনের অভিযোগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়।
এর পরের মাসে ‘লিস্ট এ’ শ্রেণির নিষিদ্ধ সামগ্রী কারাগারে প্রবেশ করানো বা কারাগার থেকে বের করে নেওয়ার ষড়যন্ত্রের অভিযোগেও তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আদালত পেট্রিকে ছয় বছর তিন মাসের কারাদণ্ড দেয়।
সাজা ঘোষণার সময় আদালতকে জানানো হয়, জব্দ করা কোকেনের বিশুদ্ধতার মাত্রা ছিল প্রায় ৮০ শতাংশ। কারাগারের ভেতরে বিক্রি করা হলে ওই কোকেনের সম্ভাব্য মূল্য ১২ হাজার ৫০০ থেকে ২১ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত হতে পারত।
পেট্রির আর্থিক পরিস্থিতি এবং বন্দির সঙ্গে তার সম্পর্কও তার কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্য বিবেচনার সময় আদালত আমলে নেয়।
বিচারক বলেন, পেট্রি জানতেন ওই ব্যক্তি কারাদণ্ড ভোগ করছেন। তারপরও তিনি তার সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখেন এবং নিজের আর্থিক সমস্যার কারণে ধরা পড়ার ঝুঁকি জেনেও নিষিদ্ধ সামগ্রী কারাগারে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
মামলাটি পরে জেনারেল ফার্মাসিউটিক্যাল কাউন্সিল-এর একটি পেশাগত শুনানিতেও যায়। শুনানিতে পেট্রিকে পেশাগত রেজিস্টার থেকে অপসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
শুনানির সভাপতি জোয়ানা বাওয়ার বলেন, পেট্রির আচরণ ফার্মেসি পেশায় প্রত্যাশিত মানদণ্ডের গুরুতর লঙ্ঘন। তার কর্মকাণ্ড তার দায়িত্বে থাকা বন্দিদের কল্যাণের প্রতি অবহেলা এবং কারাগারের সামগ্রিক প্রশাসন ও নিরাপত্তাব্যবস্থার জন্য ঝুঁকি তৈরি করেছে।
শুনানিতে আরও বলা হয়, পেট্রি তার ওপর অর্পিত বিশ্বাসের মর্যাদা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছেন এবং পেশাগত সততা প্রদর্শন করেননি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একজন বন্দির সঙ্গে ফ্লার্টপূর্ণ যোগাযোগ বজায় রেখে তিনি পেশাগত সীমারেখাও অতিক্রম করেছেন।
নিজের পেশাগত অবস্থান ব্যবহার করে কারাগারে নিষিদ্ধ সামগ্রী প্রবেশ করানোকে গুরুতর বিশ্বাসভঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শুনানিতে বলা হয়, এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্দিদের জন্য উল্লেখযোগ্য ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি করেছে।
সূত্রঃ জিবি নিউজ
এম.কে
যুক্তরাজ্যে আশ্রয়প্রার্থী নারীদের কয়েকজন ব্রিটিশ পুরুষের বিরুদ্ধে ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন ও যৌন শোষণের অভিযোগ তুলেছেন। তবে আশ্রয়ের আবেদন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে—এমন আশঙ্কায় অনেকেই অভিযোগের পরও ফৌজদারি বিচারপ্রক্রিয়ায় যেতে ভয় পেয়েছেন বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান।
১৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দ্য গার্ডিয়ান জানায়, আশ্রয়প্রার্থী নারীদের যৌন সহিংসতার অভিজ্ঞতা তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত। একই সময়ে যুক্তরাজ্যে ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর পক্ষ থেকে পুরুষ আশ্রয়প্রার্থীদের বিরুদ্ধে নারী ও কিশোরীদের ধর্ষণের ব্যাপক অভিযোগ নিয়ে প্রচারণা জোরদার হয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ডানপন্থী আন্দোলনকারী ড্যানিয়েল থমাস, যিনি ‘ড্যানি টমো’ নামে পরিচিত, ডোভার ও পোর্টসমাউথে আশ্রয়প্রার্থীদের আগমন নিয়ে সাম্প্রতিক বিক্ষোভে ধর্ষণের অভিযোগকে অন্যতম প্রধান বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছেন। তবে আশ্রয়প্রার্থীদের মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধের সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরার মতো কোনো পূর্ণাঙ্গ প্রকাশিত সরকারি তথ্য-উপাত্ত নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে এক নারী আশ্রয়প্রার্থীর অভিযোগ তুলে ধরা হয়, যিনি ধর্মীয় নিপীড়ন ও পারিবারিক সহিংসতা থেকে পালিয়ে যুক্তরাজ্যে এসে দুই বছর একটি আশ্রয় হোটেলে ছিলেন। তার অভিযোগ, ওই হোটেলের একজন কর্মী তাকে নিয়মিত মৌখিক ও শারীরিকভাবে হয়রানি করতেন।
ওই নারী জানান, নথিপত্র দেওয়ার সময় কর্মীটি তার অনুমতি ছাড়া তাকে স্পর্শ করতেন এবং তার হাত ধরে রাখতেন। পরে তিনি নিয়মিত ওই নারীর কক্ষে যেতে শুরু করেন এবং তাকে পানীয় পান ও ডেটে যাওয়ার প্রস্তাব দেন। একপর্যায়ে হোটেলের ডাটাবেস থেকে ওই নারীর ফোন নম্বর নিয়ে ব্যক্তিগত ফোনে বার্তা পাঠিয়ে যৌন সম্পর্কের প্রস্তাব দেওয়া হয়।
পরে বিষয়টি হোটেল কর্তৃপক্ষকে জানালে তাকে অন্য একটি হোটেলে স্থানান্তর করা হয়।
অন্য এক ইরানি নারী, যিনি যুক্তরাজ্যে আসার পর হিথ্রো বিমানবন্দরের কাছে হোম অফিসের ব্যবস্থাপনায় একটি হোটেলে ছিলেন, অভিযোগ করেন যে ওই হোটেলের একজন নিরাপত্তাকর্মী তাকে ধর্ষণ করেন।
তিনি জানান, হামলার পর হোটেল কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হলেও পুলিশের কাছে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিতে তিনি ভয় পেয়েছিলেন। ইরানের পুলিশের সঙ্গে তার পূর্ব অভিজ্ঞতার কারণে যুক্তরাজ্যের পুলিশ কীভাবে বিষয়টি নেবে তা নিয়ে তিনি আতঙ্কিত ছিলেন।
একই সঙ্গে তার আশঙ্কা ছিল, ধর্ষণের অভিযোগ করলে তার আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যেতে পারে। অভিযোগ জানানোর পর তাকে অন্য একটি হোটেলে স্থানান্তর করা হয়। অভিযুক্ত নিরাপত্তাকর্মীর বিরুদ্ধে পরে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না।
আরেক ঘটনায় উগান্ডার এক লেসবিয়ান আশ্রয়প্রার্থী অভিযোগ করেন, তার অভিবাসন মামলায় আইনি সহায়তার বিনিময়ে একজন ব্যক্তিগত অভিবাসন আইনজীবী তাকে যৌন সম্পর্ক করতে বাধ্য করেন। ওই নারী জানান, নিজের যৌন পরিচয়ের কারণে নিজ দেশে কারাবন্দি কিংবা মৃত্যুর আশঙ্কায় তিনি যুক্তরাজ্যে আশ্রয়ের আবেদন করেছিলেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, আইনি সহায়তার জন্য তার কাছে অর্থ না থাকায় ওই আইনজীবী যৌন সম্পর্ককে পারিশ্রমিক হিসেবে দাবি করেন। ওই নারী জানান, পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার মতো কোনো উপায় তার ছিল না।
দ্য গার্ডিয়ান জানায়, তিন নারীই পরবর্তীতে যুক্তরাজ্যে শরণার্থী মর্যাদা লাভ করেন।
আশ্রয় আবাসনে যৌন নিপীড়নের ঘটনা বাস্তব সংখ্যার তুলনায় কম রিপোর্ট করা হয়ে থাকতে পারে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে হোম অ্যাফেয়ার্স সিলেক্ট কমিটির এক তদন্তে আশ্রয় আবাসনে নিরাপত্তা ও সুরক্ষাব্যবস্থার ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
তদন্তে ব্রিটিশ রেড ক্রস আশ্রয় আবাসনে নিরাপত্তার ঘাটতির কারণে শরণার্থী সহায়তা কার্যক্রমে থাকা কর্মীদের ওপর “অসাধারণ চাপ” তৈরি হওয়ার কথা জানায়। তাদের দেওয়া উদাহরণের মধ্যে ছিল—একটি হোটেলে গভীর রাতে একজন কর্মী গোসলরত এক নারীর কক্ষে প্রবেশের চেষ্টা করেছিলেন।
একটি আশ্রয় হোটেলে যৌন হয়রানির ব্যাপক পরিবেশ থাকার অভিযোগও তদন্তে তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে যৌন নিপীড়নের ঘটনাও ছিল বলে ব্রিটিশ রেড ক্রস জানিয়েছে।
আশ্রয়প্রার্থী নারীদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন উইমেন ফর রিফিউজি উইমেন বলেছে, নারী ও কিশোরীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার বিষয়কে ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর রাজনৈতিক প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না।
সংগঠনটির একজন মুখপাত্রের মতে, এ ধরনের প্রচারণা নির্যাতনের বাস্তবতাকে বিকৃত করে, ভুক্তভোগীদের সহায়তা ও বিচার পাওয়ার পথে বাধা তৈরি করে এবং বর্ণবাদী ধারণার আড়ালে অপরাধীদের জবাবদিহির বাইরে থাকার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
সংগঠনটি আরও বলেছে, যুক্তরাজ্যে নিরাপত্তার জন্য আসা মানুষদের বিরুদ্ধে নারী ও কিশোরীদের ওপর সহিংসতার বিষয়কে ব্যবহার করা একটি বিপজ্জনক বিভ্রান্তি। তাদের বক্তব্য, নারী ও কিশোরীদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা কোনো নির্দিষ্ট জাতীয়তা বা অভিবাসন অবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
রেপ ক্রাইসিস ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস-এর প্রধান নির্বাহী সিয়ারা বার্গম্যানও আশ্রয়প্রার্থী নারীদের সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, যৌন সহিংসতা, নির্যাতন ও শোষণ থেকে আশ্রয়প্রার্থী নারীদের রক্ষায় যথাযথ নিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকায় তার সংগঠন উদ্বিগ্ন।
তার মতে, আশ্রয়প্রার্থী নারী ও কিশোরীরা যৌন নির্যাতন ও শোষণের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। অনেকেরই নিজেদের অধিকার সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য নেই এবং অধিকার প্রয়োগের কার্যকর সুযোগও সীমিত।
বার্গম্যান বলেন, ব্রিটিশ সরকার এক দশকের মধ্যে নারী ও কিশোরীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা অর্ধেকে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সেই উদ্যোগে যুক্তরাজ্যে আশ্রয়প্রার্থী ও আশ্রয় ব্যবস্থার মধ্যে বসবাসরত নারী ও কিশোরীদেরও অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
এদিকে হোম অফিস জানিয়েছে, তাদের আবাসন ব্যবস্থায় এ ধরনের অভিযোগ মোকাবিলার জন্য নির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। আশ্রয় আবাসন ও সহায়তার স্টেটমেন্ট অব রিকোয়ারমেন্টস-এ অভিযোগের শিকার ব্যক্তি ও অন্যদের তাৎক্ষণিক ঝুঁকি মূল্যায়ন, প্রয়োজনীয় সহায়তা নির্ধারণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান
এম.কে
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রকাশিত নতুন সরকারি হোম অফিসের তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যের সাম্প্রতিক অভিবাসন বিধিনিষেধের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে উচ্চশিক্ষা ও ডেন্টাল সেবায়। স্কিলড ওয়ার্কার ভিসার নিয়ম কঠোর করার এক বছর পর বিদেশি ডেন্টাল নার্সদের স্পনসরড এন্ট্রি ক্লিয়ারেন্স অনুমোদন ৯৫ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে ২০২৬ সালের আগস্টে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার জন্য স্টাডি ভিসার আবেদন আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৬ শতাংশ কমেছে।
উচ্চশিক্ষা খাতের নেতৃবৃন্দ ও ডেন্টাল সেবা প্রদানকারীদের মধ্যে এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের আশঙ্কা, বিদেশি শিক্ষার্থী ও কর্মী নিয়োগে দীর্ঘমেয়াদি সংকোচন হলে কিছু আঞ্চলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক সক্ষমতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত ডেন্টাল সেবা পরিচালনা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সংখ্যা কমে যাওয়ার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। যুক্তরাজ্যের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় বিদেশি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে তুলনামূলক বেশি টিউশন ফি পেয়ে থাকে। এসব আয় অনেক ক্ষেত্রে দেশীয় শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি থেকে তৈরি আর্থিক ঘাটতি পূরণে ভূমিকা রাখে।
বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিবাসনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক জেনি ফিলিমোরের বক্তব্য অনুযায়ী, বিদেশি শিক্ষার্থীদের ফি থেকে পাওয়া আয় কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক কাঠামোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, শিক্ষার্থী সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে থাকলে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আর্থিক সংকটে পড়তে পারে এবং ঋণদাতাদের চাপের মুখোমুখি হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কমার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। ২০২৩ সালে অধিকাংশ পোস্টগ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থীর নির্ভরশীল স্বজনদের যুক্তরাজ্যে নিয়ে আসার সুযোগ সীমিত করা হয়। এর পাশাপাশি যুক্তরাজ্যে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ওপর সম্ভাব্য নতুন শুল্ক আরোপের বিষয়টিও শিক্ষার্থীদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে বলে খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
অন্যদিকে ডেন্টাল সেবায় কর্মী সংকটের বিষয়টিও সামনে এসেছে। ডেন্টিস্টদের জন্য বিদেশি কর্মী স্পনসর করার সুযোগ থাকলেও ডেন্টাল নার্স ও হাইজিনিস্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক পেশাগুলো নতুন বিদেশি কর্মী নিয়োগের চ্যানেল থেকে বাদ পড়েছে।
ডেন্টার্টিস্ট্রির শুশান্থ সুন্থাররাজনের বক্তব্য অনুযায়ী, ডেন্টাল প্র্যাকটিসগুলো বিদেশ থেকে কর্মী নিয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হারিয়েছে। ফলে কর্মী নিয়োগের প্রচলিত ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
ডেন্টাল খাতের অন্যান্য ক্লিনিক্যাল পরিচালকও বিদেশি কর্মী নিয়োগের ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, নিয়ন্ত্রক ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি হোম অফিসের ফি বাড়ার কারণে স্বতন্ত্র ডেন্টাল প্র্যাকটিসগুলোর জন্য বিদেশ থেকে কর্মী নিয়োগ করা আগের তুলনায় ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।
ডেন্টাল নার্স ও অন্যান্য সহায়ক কর্মীদের ঘাটতি বাড়লে রোগীদের অ্যাপয়েন্টমেন্ট, চিকিৎসার সময়সূচি এবং নতুন রোগী গ্রহণের সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে বলে খাতসংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
শিক্ষা খাতেও একই ধরনের প্রভাব নিয়ে আলোচনা চলছে। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সংখ্যা কমে গেলে বিদেশি শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি থেকে উল্লেখযোগ্য আয় করা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর আর্থিক চাপ বাড়তে পারে। বিশেষ করে যেসব আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী আয়ের ওপর বেশি নির্ভরশীল, তাদের জন্য পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
একই সময়ে বিদেশি কর্মী নিয়োগ কমে যাওয়ার ফলে স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য স্থানীয় পরিষেবায় প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করাও একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। ডেন্টাল খাতে ডেন্টিস্টদের পাশাপাশি নার্স, হাইজিনিস্ট ও অন্যান্য সহায়ক কর্মীদের ভূমিকা রোগীসেবা পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারের অভিবাসন নীতির অন্যতম লক্ষ্য যুক্তরাজ্যে অভিবাসনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা এবং বিদেশি কর্মী ও শিক্ষার্থীদের প্রবেশের ক্ষেত্রে নতুন শর্ত আরোপ করা। তবে সাম্প্রতিক সরকারি তথ্যের পর শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে এসব নীতির প্রভাব নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
দ্য ড্যাজলিং ডন
এম.কে
