Categories
আন্তর্জাতিক

দক্ষিণ এশিয়ায় নীরবে প্রভাব বাড়াচ্ছে চীনঃ বদলাচ্ছে রাজনৈতিক ভাবনাও

দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাব এখন আর শুধু বাণিজ্য, ঋণ, অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দেশটির দ্রুত অর্থনৈতিক উত্থান এবং দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার সাফল্য দক্ষিণ এশিয়ার কিছু রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী মহলে নতুন ধরনের বিতর্ক তৈরি করছে। প্রশ্ন উঠছে, ঘনঘন সরকার পরিবর্তনের বদলে দীর্ঘমেয়াদি ও শক্তিশালী সরকার কি উন্নয়নের জন্য বেশি কার্যকর? আর এই প্রশ্নের মধ্য দিয়েই চীনের রাষ্ট্রপরিচালনার মডেল দক্ষিণ এশিয়ার গণতান্ত্রিক দেশগুলোর রাজনৈতিক আলোচনায় প্রভাব ফেলছে কি না, তা নিয়ে বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে।

সম্প্রতি প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধে শ্রীলঙ্কার ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক এ. জাথিন্দ্র এমনই একটি প্রবণতার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। ২৬ আগস্ট সাউথ এশিয়া মনিটরে প্রকাশিত ‘বেইজিংস সাবটল পাওয়ার প্লে ইন সাউথ এশিয়া: ইজ চায়নাজ গভর্ন্যান্স মডেল ইনফ্লুয়েন্সিং ডেমোক্র্যাটিক নেশনস?’ শীর্ষক লেখায় তিনি দক্ষিণ এশিয়ার ছোট গণতান্ত্রিক দেশগুলোর ওপর চীনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাবের বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করেছেন।

চীনের অর্থনৈতিক সাফল্য এ আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। কয়েক দশকে বিপুল জনগোষ্ঠীকে দারিদ্র্য থেকে বের করে এনে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার অভিজ্ঞতা উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাছে বেইজিংকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। কিন্তু সমালোচকদের উদ্বেগ হলো, চীনের অর্থনৈতিক সাফল্যের প্রশংসা ধীরে ধীরে দেশটির একদলীয় রাজনৈতিক কাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রপরিচালনার মডেলের প্রতিও আকর্ষণে পরিণত হতে পারে।

শ্রীলঙ্কায় এ ধরনের আলোচনা বিশেষভাবে দৃশ্যমান বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপাকসের সময় চীনের কাছ থেকে উন্নয়ন পরিকল্পনা ও রাষ্ট্র পরিচালনা সম্পর্কে অভিজ্ঞতা নেওয়ার আগ্রহ দেখা যায়। দেশটির ব্যবসায়ী মহলেও প্রশ্ন উঠেছে, প্রতি পাঁচ বছর পরপর সরকার পরিবর্তন হলে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা কতটা বজায় রাখা সম্ভব।

শ্রীলঙ্কা–কোরিয়া ব্যবসায়ী পরিষদের এক আলোচনায় ব্যবসায়ী নেত্রী অরোশি নানায়াক্কারাও দীর্ঘমেয়াদি সরকারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। একই ধরনের মত দিয়েছেন জনতা বিমুক্তি পেরামুনার সাধারণ সম্পাদক টিলভিন সিলভা। এর মধ্য দিয়ে চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা সরাসরি গ্রহণের আহ্বান না থাকলেও দেশটির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও উন্নয়ন মডেল নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় আগ্রহ তৈরি হওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে।

এখানেই চীনের কৌশলকে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের পদ্ধতি থেকে আলাদা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। স্নায়ুযুদ্ধের সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন সরাসরি কমিউনিস্ট মতাদর্শ ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। বিপরীতে চীন গণতান্ত্রিক দেশগুলোকে প্রকাশ্যে তার রাজনৈতিক ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানায় না। বরং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন, বিনিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে নিজেদের মডেলকে কার্যকর বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করছে—এমনটাই বিশ্লেষণে বলা হয়েছে।

চীনের ‘অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার’ নীতিও এ আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বেইজিং আনুষ্ঠানিকভাবে এই নীতির কথা বললেও বাস্তবে কিছু ঘটনায় তার প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এর উদাহরণ হিসেবে নেপালের একটি একাডেমিক সম্মেলনের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

২০২৬ সালের জুলাইয়ে কাঠমান্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক তিব্বত অধ্যয়নবিষয়ক একটি সম্মেলন আয়োজনের পরিকল্পনা ছিল। আয়োজকদের প্রস্তুতি অনুযায়ী ৩৯টি দেশের ৭০০-এর বেশি গবেষকের অংশ নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু চীনের উদ্বেগের পর নেপালি কর্তৃপক্ষ বিশ্ববিদ্যালয়কে অনুষ্ঠানটি না করার নির্দেশ দেয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজকের ভূমিকা থেকে সরে যায় বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

তিব্বত ইস্যুতে নেপালের অবস্থানও চীনের প্রভাবের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। নেপালে তিব্বতি শরণার্থী জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি রয়েছে। দেশটি তিব্বতি শরণার্থীদের দালাই লামার জন্মদিন পালনের অনুমতি দিলেও তিব্বতি জাতীয় সংগীত, মিছিল, স্লোগান এবং নির্বাসিত তিব্বতি প্রশাসনের বক্তব্যের মতো কর্মকাণ্ডের ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে। এসব পদক্ষেপ নেপালের নিজস্ব নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির অংশ হতে পারে; তবে বিশ্লেষণে এগুলোকে চীনের রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার প্রভাবের দৃষ্টান্ত হিসেবেও দেখা হয়েছে।

শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রশ্ন সামনে এসেছে। দালাই লামার ক্যান্ডির টেম্পল অব দ্য টুথ ও অনুরাধাপুরার মহাবোধি বৃক্ষে ধর্মীয় উপাসনার অনুরোধ প্রত্যাখ্যানের বিষয়টি চীনের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—কোনো রাষ্ট্র নিজের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় একটি শক্তিশালী বিদেশি রাষ্ট্রের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়াকে কতটা বিবেচনায় নিলে সেটিকে প্রকৃত অর্থে ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা’ বলা যায়?

চীনের নীতির এই বৈপরীত্যকে বিশ্লেষক ‘কৌশলগত দ্বৈততা’ হিসেবে দেখেছেন। তার মতে, নিজেদের স্বার্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে চীন অন্য দেশের নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করতে পারে, আবার অন্য কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক উদ্যোগ তার কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলে ভিন্ন অবস্থানও নিতে পারে।

দক্ষিণ এশিয়ার ছোট দেশগুলোর জন্য এখানেই তৈরি হচ্ছে বড় ধরনের দ্বিধা। একদিকে চীনের অর্থনৈতিক সহযোগিতা অবকাঠামো, বিনিয়োগ ও উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করছে। অন্যদিকে সেই অর্থনৈতিক সম্পর্ক যদি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে, তাহলে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।

তবে চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক থাকাই যে সমস্যা—বিশ্লেষণের মূল বক্তব্য এমন নয়। বরং অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ চীনের কাছ থেকে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোগত সহায়তা নেওয়া হলেও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত যেন কোনো বিদেশি শক্তির রাজনৈতিক নির্ভরতার দিকে না যায়, সেটিই বড় চ্যালেঞ্জ।

এই প্রেক্ষাপটে চীনের প্রভাবকে শুধু রাস্তা, বন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র বা ঋণের হিসাব দিয়ে পরিমাপ করা যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। উন্নয়ন ও রাষ্ট্রপরিচালনার একটি বিকল্প মডেল হিসেবে চীনের সাফল্য যদি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক চিন্তায় জায়গা করে নেয়, তবে সেটিই হতে পারে বেইজিংয়ের সবচেয়ে সূক্ষ্ম প্রভাব।

চীনের অর্থনৈতিক উত্থান যে দক্ষিণ এশিয়ার জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে এই সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক প্রভাবও উপেক্ষা করা কঠিন। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সামনে এখন মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—চীনের অর্থনৈতিক সহযোগিতা গ্রহণের পাশাপাশি কীভাবে নিজেদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রাখা যায়।

সূত্রঃ সাউথ এশিয়া মনিটর

এম.কে

Categories
আন্তর্জাতিক

নিজস্ব আকাশ প্রতিরক্ষায় ২০০টির বেশি শত্রু বিমান ভূপাতিতের দাবি ইরানের

নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করে সাম্প্রতিক যুদ্ধে ২০০টিরও বেশি শত্রু বিমান ভূপাতিত করার দাবি করেছে ইরান। দেশটির বিমান প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলিরেজা এলহামি এ দাবি করেছেন।

মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা দিবস উপলক্ষে দেওয়া এক বার্তায় এলহামি বলেন, দেশের সামরিক প্রয়োজন ও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নিয়ে ইরান নিজস্ব প্রযুক্তিতে বিভিন্ন ধরনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি ও মোতায়েন করেছে। এসব ব্যবস্থার কয়েকটির কোনো পরিচিত বিদেশি সমকক্ষ নেই বলেও দাবি করেন তিনি।

ইরানি কমান্ডারের দাবি, সাম্প্রতিক সংঘাতের সময় এসব দেশীয় প্রযুক্তির কিছু ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয় এবং সেগুলো ২০০টির বেশি শত্রু বিমান ধ্বংসে ভূমিকা রাখে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষ বাহিনী কোন ধরনের ইরানি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তাদের বিমানকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে, সেটিও শনাক্ত করতে পারেনি বলে দাবি করেন তিনি।

এলহামির বক্তব্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ইরানের নিজস্ব প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা সক্ষমতার গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করেছে। বিদেশি প্রযুক্তি ও সরঞ্জামের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরিকে তাই দেশটির সামরিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ইরানের সেনাবাহিনীর উপ-সমন্বয়ক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ সাদেঘিয়ান জানিয়েছেন, দেশজুড়ে ৩ হাজার ৮০০টিরও বেশি কৌশলগত স্থানে আকাশ প্রতিরক্ষা ইউনিট মোতায়েন রয়েছে। মরুভূমি, উপকূলীয় এলাকা, দ্বীপ ও পার্বত্য অঞ্চলসহ বিভিন্ন ভৌগোলিক এলাকায় এসব ইউনিট ছড়িয়ে রয়েছে।

সাদেঘিয়ানের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব ইউনিটের প্রধান দায়িত্ব হলো আকাশসীমায় সম্ভাব্য হুমকি শনাক্ত করা, লক্ষ্যবস্তুর গতিপথ নির্ধারণ, তা প্রতিহত করা এবং প্রয়োজন হলে ধ্বংস করা। বিস্তৃত ভৌগোলিক এলাকায় ইউনিট মোতায়েনের মাধ্যমে ইরান তার আকাশসীমার বিভিন্ন অংশে নজরদারি ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থা বজায় রাখার চেষ্টা করছে।

ইরানের সামরিক কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের সার্বভৌমত্ব ও আকাশসীমা রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষার জন্য জনগণ ও সামরিক বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সংঘাতের অভিজ্ঞতার পর নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সক্ষমতা আরও বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

ইরানের এই দাবি এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন দেশটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক উত্তেজনা আবারও বেড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও রাডার অবস্থানে হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে। পাল্টা ইরানও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সামরিক অবস্থান লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে।

এই পরিস্থিতিতে ইরানের সামরিক নেতৃত্বের বক্তব্যে দেশীয় প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিস্তার, দ্রুত লক্ষ্য শনাক্ত করার সক্ষমতা এবং বিভিন্ন ধরনের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি নিজস্বভাবে উন্নয়নের মাধ্যমে সম্ভাব্য বিমান হামলা মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যেই তেহরান এগোচ্ছে বলে কর্মকর্তাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।

সূত্রঃ প্রেস টিভি

এম.কে

Categories
বাংলাদেশ

ভারতের ওপর নির্ভরতায় ঝুঁকিতে বাংলাদেশের ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব

দেশে ইন্টারনেট ও ডিজিটাল সেবার ব্যবহার দ্রুত বাড়লেও আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের বড় অংশের জন্য এখনো ভারতের ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশ। ইন্টারন্যাশনাল টেরিস্ট্রিয়াল ক্যাবল বা আইটিসির মাধ্যমে ভারত থেকে ব্যান্ডউইথ আমদানির কারণে গত আট বছরে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৫ কোটি মার্কিন ডলার ভারতে গেছে। একই সঙ্গে ভারতের ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে বিপুল পরিমাণ তথ্য প্রবাহিত হওয়ায় রাষ্ট্রীয়, বাণিজ্যিক ও নাগরিক যোগাযোগের স্পর্শকাতর তথ্যের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, একটি দেশের আন্তর্জাতিক যোগাযোগব্যবস্থা যদি কোনো একটি প্রতিবেশী দেশের অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে তা শুধু অর্থনৈতিক নয়, জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাদের আশঙ্কা, ভারতের ভূখণ্ড দিয়ে বাংলাদেশি তথ্যের ট্রানজিট হওয়ায় দেশটির বিদ্যমান আইন ও নজরদারি কাঠামোর আওতায় এসব তথ্য বা তথ্যপ্রবাহের কিছু অংশ পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের চাহিদা গত এক দশকে ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ২০১৫ সালে যেখানে দেশে ব্যান্ডউইথের ব্যবহার ছিল প্রায় ১৪১ গিগাবিটস পার সেকেন্ড, ২০২৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩ দশমিক ৫ টেরাবিটস পার সেকেন্ডে। অর্থাৎ ১১ বছরে চাহিদা বেড়েছে ৯৫ গুণেরও বেশি। স্মার্টফোন, উচ্চগতির মোবাইল নেটওয়ার্ক, ভিডিও স্ট্রিমিং, ক্লাউড সেবা ও ডিজিটাল ব্যবসার বিস্তারের সঙ্গে ভবিষ্যতে এই চাহিদা আরও দ্রুত বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

খাতসংশ্লিষ্ট পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৮ সালে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের চাহিদা প্রায় ২৭ টেরাবিটস পার সেকেন্ডে পৌঁছাতে পারে। ২০৩০ সালে তা ৫৪ টেরাবিটস, ২০৩২ সালে ১০৮ টেরাবিটস, ২০৩৪ সালে ২১৬ টেরাবিটস এবং ২০৩৬ সালে ৪৩২ টেরাবিটস পর্যন্ত হতে পারে। ফলে ভবিষ্যতের চাহিদা পূরণে এখন থেকেই বিকল্প আন্তর্জাতিক সংযোগ ও নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশ দুটি সাবমেরিন ক্যাবলের সঙ্গে যুক্ত। বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানি লিমিটেডের মাধ্যমে সি-মি-উই-৪ থেকে প্রায় ৪ দশমিক ৬ টেরাবিটস এবং সি-মি-উই-৫ থেকে ২ দশমিক ৫ টেরাবিটস ব্যান্ডউইথ পাওয়া যায়। দুই ক্যাবল মিলিয়ে সক্ষমতা প্রায় ৭ দশমিক ১ টেরাবিটস। বিপরীতে বর্তমানে প্রায় ১৩ দশমিক ৫ টেরাবিটস চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণ হচ্ছে আইটিসি অপারেটরদের মাধ্যমে।

এ অবস্থায় নতুন সাবমেরিন ক্যাবল সংযোগ দ্রুত নিশ্চিত না হলে আগামী কয়েক বছরে ভারতের ওপর নির্ভরতা আরও বাড়তে পারে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, কোনো কারণে আইটিসি সংযোগে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে দেশের আর্থিক লেনদেন, ফ্রিল্যান্সিং, রপ্তানিমুখী শিল্প, সরকারি সেবা এবং সাধারণ ইন্টারনেট ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশের ডিজিটাল অবকাঠামোর আরেকটি উদ্বেগের জায়গা হলো বিদ্যমান সাবমেরিন ক্যাবলগুলোর সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ চাহিদার মধ্যে ব্যবধান। ২০০৫ সালে চালু হওয়া সি-মি-উই-৪-এর নির্ধারিত আয়ুষ্কালও শেষ পর্যায়ে। অন্যদিকে নতুন সি-মি-উই-৬ নিয়ে বিভিন্ন জটিলতার কারণে এর কার্যক্রম শুরু হতে সময় লাগতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভারতের আইন নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি আইন-২০০০-এর ৬৯ ধারায় নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কম্পিউটার সম্পদ বা সার্ভারের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত তথ্য নজরদারি, আটক বা ডিক্রিপ্ট করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। একইভাবে ভারতের টেলিযোগাযোগ আইন-২০২৩-এর ২০ ধারায় জননিরাপত্তা বা জরুরি পরিস্থিতিতে টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্কের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণের বিধান রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইন্টারনেটের অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ এনক্রিপ্টেড হলেও শুধু মূল বার্তার বিষয়বস্তুই নিরাপত্তার বিষয় নয়। কে কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে, কখন যোগাযোগ করছে, কত পরিমাণ তথ্য আদান-প্রদান হচ্ছে এবং কোন আইপি ঠিকানা থেকে যোগাযোগ হচ্ছে—এসব তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ। এসব তথ্যকে কেন্দ্র করে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রীয় সংস্থার যোগাযোগের ধরন বিশ্লেষণ করা সম্ভব বলে তারা মনে করছেন।

এ ছাড়া দুর্বল নিরাপত্তাব্যবস্থা বা ভুল নেটওয়ার্ক বিন্যাসের কারণে কিছু তথ্য মাঝপথে বাধাগ্রস্ত বা অন্য পথে পরিচালিত হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সীমান্ত গেটওয়ে প্রোটোকল বা বিজিপি-সংক্রান্ত ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করেছেন। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক যোগাযোগব্যবস্থায় কোনো একটি দেশের অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা থাকলে প্রযুক্তিগত সমস্যার পাশাপাশি কৌশলগত ঝুঁকিও তৈরি হয়।

তবে এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকার বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানিয়েছেন, তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে কিছু ঝুঁকি রয়েছে এবং সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করছে। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৭ সালের মধ্যে বাংলাদেশ নতুন একটি সাবমেরিন ক্যাবলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা করছে, যেখান থেকে প্রায় ১৭ টেরাবিটস ব্যান্ডউইথ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি তিনটি কোম্পানি মিলে একটি জোটের মাধ্যমে নতুন সাবমেরিন ক্যাবল আনার উদ্যোগ নিয়েছে; এ বিষয়েও সরকার কাজ করছে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু নতুন ক্যাবল যুক্ত করাই যথেষ্ট নয়; আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের উৎসও বহুমুখী করতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে একাধিক সাবমেরিন ক্যাবলে যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ তথ্যপ্রবাহ যাতে অপ্রয়োজনে বিদেশি নেটওয়ার্কের মধ্য দিয়ে না যায়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।

বর্তমানে এশিয়ার অনেক দেশই একাধিক সাবমেরিন ক্যাবলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য তৈরি করেছে। তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশের সীমিতসংখ্যক সাবমেরিন সংযোগ এবং আইটিসিনির্ভরতা তাই দীর্ঘমেয়াদে একটি কৌশলগত দুর্বলতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল অর্থনীতি যত বড় হবে, তথ্যের নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সংযোগের স্বাধীনতাও তত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তাই ব্যান্ডউইথের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিদেশি কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে নিরাপদ, বহুমুখী ও নিজস্ব ডিজিটাল অবকাঠামো গড়ে তোলাই বাংলাদেশের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

সূত্রঃ মুসলিম উম্মাহ\ দৈনিক ইনকিলাব

এম.কে

Categories
আন্তর্জাতিক

বন্ডের অনুমোদন নবায়ন করল না লুক্সেমবার্গঃ ইউরোপীয় বাজারে চাপে ইসরায়েল

গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সমালোচনার মধ্যেই ইসরায়েলি বন্ডের অনুমোদন আর নবায়ন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইউরোপের দেশ লুক্সেমবার্গ। এর ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের আর্থিক বাজার থেকে ঋণ সংগ্রহের ক্ষেত্রে ইসরায়েলের সামনে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

৩১ আগস্ট ইসরায়েলি বন্ডের প্রসপেক্টাসের অনুমোদনের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সেটি আর নবায়ন করা হয়নি। লুক্সেমবার্গের অর্থমন্ত্রী জিলস রথ দেশটির সম্প্রচারমাধ্যম আরটিএলকে জানিয়েছেন, আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিএসএসএফ গত মে মাসেই আগস্টের পর ইসরায়েলি বন্ডের অনুমোদন না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের কোনো দেশ ইউরোপীয় বাজারে বন্ড বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহ করতে চাইলে সাধারণত ইইউভুক্ত একটি দেশের আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন প্রয়োজন হয়। ইসরায়েল দীর্ঘদিন এই ব্যবস্থার আওতায় ইউরোপীয় বাজার ব্যবহার করে আসছিল।

যুক্তরাজ্য ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর আয়ারল্যান্ড ইসরায়েলি বন্ডের নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করছিল। তবে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলার প্রতিবাদে আয়ারল্যান্ড গত বছর এই অনুমোদন নবায়ন বন্ধ করে দেয়। এরপর লুক্সেমবার্গ দায়িত্বটি গ্রহণ করলেও সেখানেও ইসরায়েলি বন্ড নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়।

মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল গত জুলাইয়ে লুক্সেমবার্গসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোকে ইসরায়েলি বন্ড বিক্রি বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছিল। সংস্থাটির অভিযোগ, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বন্ডের মাধ্যমে সংগ্রহ করা অর্থ ইসরায়েল সরকার গাজা ও ফিলিস্তিনে সামরিক অভিযানে ব্যবহার করছে।

অ্যামনেস্টির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ইসরায়েল আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বন্ডের মাধ্যমে প্রায় ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো এসব অর্থের ব্যবহার এবং ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের সঙ্গে এর সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে।

লুক্সেমবার্গের সিদ্ধান্তের ফলে ইউরোপীয় বাজারে নতুন করে বন্ড ইস্যু করতে হলে ইসরায়েলকে এখন অন্য কোনো ইইউ সদস্য দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন নিতে হবে। তবে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গাজা যুদ্ধ নিয়ে জনমত ও রাজনৈতিক চাপ বাড়তে থাকায় নতুন কোনো দেশ ইসরায়েলি বন্ডের দায়িত্ব নিতে আগ্রহী হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের আর্থিক বাজার থেকে ইসরায়েল প্রতিবছর প্রায় ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করে আসছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশের পথ সংকুচিত হলে ইসরায়েলের অর্থ সংগ্রহের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে।

তবে ইউরোপীয় বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হলেও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ইসরায়েলি বন্ড বিক্রি এখনো চালু রয়েছে। ফলে ইউরোপে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থ সংগ্রহের পথ বাধাগ্রস্ত হলেও আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ইসরায়েলের অর্থ সংগ্রহের সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে না।

লুক্সেমবার্গের এই সিদ্ধান্তকে ইসরায়েলের ওপর ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপের আরেকটি উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের অবস্থান কঠোর হওয়ায় ইসরায়েলের সঙ্গে আর্থিক সম্পর্ক নিয়েও নতুন করে বিতর্ক দেখা দিয়েছে।

সূত্রঃ অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল\আল জাজিরা

এম.কে

Categories
বাংলাদেশ

বাংলাদেশে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে যুক্তরাজ্যের বার্কলেস ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা

সুন্দরবনের কাছে নির্মিত রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে আর্থিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে যুক্তরাজ্যের অন্যতম বৃহৎ ব্যাংক বার্কলেসের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের সুন্দরবন অঞ্চলের তিন ব্যক্তি ও সংগঠন যুক্তরাজ্য সরকারের অফিস ফর রেসপন্সিবল বিজনেস কন্ডাক্টে এই অভিযোগ দাখিল করেছেন।

অভিযোগকারীদের দাবি, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার আগে প্রকল্পটির পরিবেশগত ও মানবাধিকার ঝুঁকি যথাযথভাবে যাচাই করেনি বার্কলেস। তাদের অভিযোগ, এ ধরনের আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক দায়িত্বশীল ব্যবসা পরিচালনার নির্দেশনা লঙ্ঘন করেছে ব্যাংকটি।

রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রটি মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্রকল্পের অংশ। ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত হয়েছে এবং সুন্দরবনের কাছেই পশুর নদীর তীরে এর অবস্থান। সুন্দরবন বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন এবং ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত।

অভিযোগে বলা হয়েছে, রামপাল প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ ও বন্ড ইস্যুতে আন্ডাররাইটিং সেবা দিয়েছে বার্কলেস। অভিযোগকারীদের সহায়তাকারী কিংস হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, ভারতের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এনটিপিসি লিমিটেডের ঋণ আন্ডাররাইট করেছে ব্যাংকটি। এনটিপিসি রামপাল প্রকল্পের অন্যতম যৌথ অংশীদার।

এ ছাড়া ২০১৬ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে ভারতের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংকের বন্ড ইস্যুতেও বার্কলেসের ভূমিকা ছিল বলে জানিয়েছে ক্লিনিকটি। ওই ভারতীয় প্রতিষ্ঠান পরবর্তী সময়ে রামপাল প্রকল্পে ঋণ দেয়।

ঢাকাভিত্তিক পরিবেশকর্মী শরীফ জামিল অভিযোগকারীদের একজন। তার দাবি, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র ও আশপাশের শিল্পকারখানা থেকে সৃষ্ট ভারী ধাতুর দূষণ সুন্দরবনের আন্তঃসংযুক্ত নদী ও খালগুলোর মাধ্যমে বনে প্রবেশ করছে। পশুর নদী সুন্দরবনের পরিবেশব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়ায় বিদ্যুৎকেন্দ্রটির অবস্থান নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে বলে তিনি জানান।

গত নভেম্বরে প্রকাশিত একটি গবেষণায় সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকার পানিতে পারদ ও আর্সেনিকের মাত্রা বৃদ্ধির তথ্য পাওয়া যায়। সবচেয়ে বেশি ঘনত্ব পাওয়া যায় পশুর নদীতে। গবেষকেরা শিল্পবর্জ্য ও বন্দরকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডকে ভারী ধাতু দূষণের সম্ভাব্য উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেন।

গবেষণায় কয়লা পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট নির্গমন এবং রামপাল প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নৌযান চলাচল বৃদ্ধিকেও সুন্দরবনের জন্য পরিবেশগত ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের মতে, এই দূষণের প্রভাব শুধু স্থানীয় পরিবেশে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশ ও ভারতের উপকূলীয় অঞ্চলের লাখো মানুষ নদী ও বন থেকে খাদ্য এবং বিভিন্ন প্রাকৃতিক সম্পদ সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। একই সঙ্গে এই বন রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ অসংখ্য প্রাণী ও উদ্ভিদের গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল।

অভিযোগকারীরা আরও বলেছেন, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আগে থেকেই ঝুঁকিতে থাকা সুন্দরবন ঘূর্ণিঝড়সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা হিসেবে কাজ করে।

শরীফ জামিলের মতে, আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব বিবেচনা করার দায়িত্ব রয়েছে। অন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান যখন রামপাল প্রকল্প থেকে সরে গেছে বা অর্থায়ন প্রত্যাখ্যান করেছে, তখন বার্কলেসসহ অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানেরও নিজেদের নীতি পুনর্বিবেচনা করা উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তিনি জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় সম্ভাবনা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন।

অভিযোগকারীদের সহায়তাকারী কিংস হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট ক্লিনিকের আইনজীবী সু উইলম্যান বলেন, সুন্দরবনের গ্রামীণ জনগোষ্ঠী জলবায়ু ও প্রকৃতির সংকটের সম্মুখসারিতে রয়েছে। তেল ও কয়লা প্রকল্পে অর্থায়নের আগে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিবেশগত ঝুঁকি বিবেচনা করতে উদ্বুদ্ধ করাই তাদের লক্ষ্য বলে তিনি জানান।

রামপাল প্রকল্প নিয়ে পরিবেশগত উদ্বেগ অবশ্য নতুন নয়। এর আগে প্রকল্পটির পরিকল্পনা ও নির্মাণ নিয়েও আপত্তি উঠেছিল। ২০১৬ সালে ইউনেসকোর এক প্রতিবেদনে রামপাল প্রকল্পের কারণে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের বায়ু ও পানি দূষণের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল।

এদিকে যুক্তরাজ্যের ব্যবসা ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন অফিস ফর রেসপন্সিবল বিজনেস কন্ডাক্ট এখন অভিযোগটি পর্যালোচনা করবে। দপ্তরটি অভিযোগটি আনুষ্ঠানিক তদন্তের জন্য গ্রহণ করবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি।

বার্কলেস ব্যাংক এবং রামপাল প্রকল্পের হোল্ডিং কোম্পানি বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড অভিযোগের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান

এম.কে

Categories
যুক্তরাজ্য (UK)

যুক্তরাজ্যে অভিবাসীদের স্থায়ী বসবাসের নিয়ম বদল নিয়ে লেবার দলে বিদ্রোহঃ ৭৮ এমপির বিরোধিতা

যুক্তরাজ্যে অভিবাসী কর্মীদের অনির্দিষ্টকালীন বসবাসের অনুমতি বা আইএলআর (ILR) পাওয়ার নিয়মে বড় ধরনের পরিবর্তনের পরিকল্পনা নিয়ে লেবার সরকারের ভেতরেই তীব্র বিরোধিতা তৈরি হয়েছে। প্রস্তাবিত সংস্কারের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৭৮ জন এমপি একটি সংসদীয় প্রস্তাবে স্বাক্ষর করেছেন, যার মধ্যে ৪৩ জন লেবার এমপি।

লেবার এমপি নিল ডানকান-জর্ডানের উত্থাপিত প্রস্তাবে সরকারকে ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্যে থাকা স্কিলড ওয়ার্কার ভিসাধারীদের জন্য পাঁচ বছরের আইএলআর পথ বহাল রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। সংসদীয় নথিতে বলা হয়েছে, এসব কর্মী যুক্তরাজ্যে এসে কর প্রদান, অর্থনীতি ও জনসেবায় অবদান রাখছেন এবং অনেকেই পাঁচ বছর কাজ ও বসবাসের পর স্থায়ী হওয়ার প্রত্যাশায় নিজেদের জীবন গড়ে তুলেছেন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী শাবানা মাহমুদের প্রস্তাবিত ‘আর্নড সেটেলমেন্ট’ ব্যবস্থায় অধিকাংশ অভিবাসীর জন্য স্থায়ী বসবাসের সাধারণ যোগ্যতার সময়সীমা পাঁচ বছর থেকে বাড়িয়ে ১০ বছর করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় যারা যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি ও সমাজে বেশি অবদান রাখবেন, তাদের জন্য অপেক্ষার সময় তুলনামূলকভাবে কম রাখা হবে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, উচ্চ আয়ের কিছু কর্মী তিন বছরেই স্থায়ী বসবাসের যোগ্য হতে পারেন। চিকিৎসক, শিক্ষক ও নার্সদের মতো গুরুত্বপূর্ণ পেশাজীবীদের জন্য পাঁচ বছরের পথ রাখার প্রস্তাব রয়েছে। অন্যদিকে কম বেতনের বিদেশি কর্মী, বিশেষ করে কেয়ার খাতে কর্মরতদের ক্ষেত্রে অপেক্ষার সময় সর্বোচ্চ ১৫ বছর পর্যন্ত হতে পারে।

সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত অভিবাসীদের ওপর নতুন নিয়ম প্রয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে। বিরোধী এমপিদের পাশাপাশি লেবার দলের ভেতরের সমালোচকদের আশঙ্কা, মানুষ যে নিয়মের ভিত্তিতে যুক্তরাজ্যে এসে জীবন ও কর্মজীবন গড়ে তুলেছেন, পরে সেই নিয়ম পরিবর্তন করলে তাদের প্রতি অন্যায় হবে।

নিল ডানকান-জর্ডান সতর্ক করেছেন, বিদ্যমান স্কিলড ওয়ার্কারদের ক্ষেত্রে নিয়ম পরিবর্তন করা হলে তা বড় ধরনের ‘উইন্ডরাশ-ধাঁচের কেলেঙ্কারি’র জন্ম দিতে পারে। তার যুক্তি, কেয়ার হোম, রেলওয়ে কিংবা চিকিৎসা খাতে কর্মরত বহু মানুষ যুক্তরাজ্যে এসেছেন এই প্রত্যাশায় যে নির্দিষ্ট সময় কাজ ও বসবাসের পর তারা স্থায়ী হওয়ার সুযোগ পাবেন। মাঝপথে সেই শর্ত পরিবর্তন করা হলে তা অভিবাসন ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, অভিবাসন ব্যবস্থাকে আরও ন্যায্য ও টেকসই করাই সংস্কারের উদ্দেশ্য। যেসব অভিবাসী যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি, জনসেবা ও সমাজে বেশি অবদান রাখবেন, তাদের দ্রুত স্থায়ী হওয়ার সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ কমাতে নতুন কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে।

সীমান্তবিষয়ক মন্ত্রী আনা টার্লি জানিয়েছেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী এখনো নীতিটির বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করছেন। বিশেষ করে কেয়ার খাতে কর্মরতদের মতো গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু তুলনামূলক কম বেতনের কর্মীদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা করা হবে কি না, সে বিষয়েও সরকারের কাছে বিভিন্ন পক্ষ থেকে মতামত এসেছে।

সরকার ইতোমধ্যে এ বিষয়ে পরামর্শ গ্রহণের প্রক্রিয়া শেষ করেছে। স্বরাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, অধিকাংশ অভিবাসীর জন্য সাধারণ যোগ্যতার সময় ১০ বছর করার সংস্কার গত নভেম্বরে ঘোষণা করা হয়েছিল এবং যারা যুক্তরাজ্যে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখেন, তাদের জন্য অপেক্ষার সময় কম রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত চলতি শরতে প্রকাশ করার কথা।

এই পরিস্থিতিতে ৭৮ জন এমপির সমর্থন পাওয়া প্রস্তাবটি লেবার সরকারের জন্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ চাপ তৈরি করেছে। বিশেষ করে ৪৩ জন লেবার এমপির সরাসরি সমর্থন দেখাচ্ছে যে আইএলআর সংস্কার নিয়ে সরকারের ভেতরেই মতবিরোধ যথেষ্ট গভীর।

ফলে এখন মূল প্রশ্ন হলো—সরকার কি ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্যে থাকা স্কিলড ওয়ার্কারদের জন্য আগের পাঁচ বছরের স্থায়ী বসবাসের পথ বহাল রাখবে, নাকি নতুন ১০ ও ১৫ বছরের কাঠামো তাদের ক্ষেত্রেও কার্যকর করবে। শরতে সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তেই এর উত্তর মিলবে।

সূত্রঃ মিরর পলিটিক্স

এম.কে

Categories
যুক্তরাজ্য (UK)

উইন্ডসর ক্যাসেল: এক হাজার বছরের ক্ষমতা, ঐতিহ্য ও ব্রিটিশ রাজকীয়তার জীবন্ত প্রতীক

প্রায় এক হাজার বছর ধরে উইন্ডসর ক্যাসেল দাঁড়িয়ে আছে ব্রিটিশ ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দুতে—ক্ষমতা, স্থিতিস্থাপকতা এবং রাজকীয় ঐতিহ্যের এক অনন্য প্রতীক হিসেবে। ইংল্যান্ডের রাজাদের আবাসস্থল হিসেবে এটি শুধু একটি দুর্গ নয়; বরং ব্রিটিশ রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা, স্থায়িত্ব এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক জীবন্ত দলিল।

উইলিয়াম দ্য কনকারার ১১শ শতকে এই দুর্গের ভিত্তি স্থাপন করেন। নরম্যান বিজয়ের পর ইংল্যান্ডকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে তিনি যে কয়েকটি দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন, উইন্ডসর ছিল তার মধ্যে সবচেয়ে কৌশলগত। টেমস নদীর তীরে অবস্থিত এই দুর্গ লন্ডনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাজকীয় ক্ষমতার দৃশ্যমান প্রতীক হিসেবে গড়ে ওঠে।

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে উইন্ডসর ক্যাসেল শুধু রাজাদের আবাসস্থলই নয়, বরং ব্রিটিশ রাজনীতির নীরব সাক্ষী। প্ল্যান্টাজেনেট, টিউডর, স্টুয়ার্ট, হ্যানোভার এবং উইন্ডসর—প্রতিটি রাজবংশ এই দুর্গকে তাদের নিজস্ব রুচি ও প্রয়োজন অনুযায়ী রূপ দিয়েছে। কখনো এটি ছিল সামরিক দুর্গ, কখনো রাজকীয় প্রাসাদ, আবার কখনো জাতীয় সংকটের সময়ে নিরাপদ আশ্রয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রাজপরিবারের সদস্যরা লন্ডন ত্যাগ করে উইন্ডসর ক্যাসেলে অবস্থান করেছিলেন। সেই সময় দুর্গের জানালায় কালো পর্দা টানানো হতো, যাতে জার্মান বোমারু বিমান থেকে আলো দেখা না যায়। এই দুর্গ তখন ব্রিটিশ জনগণের প্রতিরোধ ও সাহসের প্রতীক হয়ে ওঠে।

উইন্ডসর ক্যাসেল যুক্তরাজ্যের রাজতন্ত্র ও রাজনীতিতে এমন এক গুরুত্ব বহন করে। এটি এক হাজার বছরের ইতিহাসের ধারাবাহিকতা, ক্ষমতার প্রতীক এবং ব্রিটিশ রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার দৃশ্যমান প্রকাশ। উইলিয়াম দ্য কনকারার যখন দুর্গটির ভিত্তি স্থাপন করেন, তখন থেকেই এটি রাজাদের আবাসস্থল, সামরিক দুর্গ এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে উইন্ডসর ক্যাসেল ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের প্রতিটি উত্থান-পতন, সংকট ও পুনর্গঠনের নীরব সাক্ষী হয়ে আছে।

রাজতন্ত্রের ধারাবাহিকতা বোঝার জন্য উইন্ডসর ক্যাসেল একটি অপরিহার্য প্রতীক। প্ল্যান্টাজেনেট,টিউডর, স্টুয়ার্ট, হ্যানোভার এবং আধুনিক উইন্ডসর রাজবংশ—প্রতিটি যুগে এই দুর্গ রাজকীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু ছিল। এডওয়ার্ড তৃতীয় এখানে সেন্ট জর্জেস চ্যাপেল প্রতিষ্ঠা করেন, যা আজও রাজপরিবারের আধ্যাত্মিক কেন্দ্র। হেনরি অষ্টমের সময় উইন্ডসর ছিল সামরিক শক্তির প্রতীক, আর এলিজাবেথ প্রথমের সময় স্প্যানিশ আর্মাডার সংকটে এটি ছিল নিরাপদ আশ্রয়। চার্লস প্রথমের রাজনৈতিক নাটকীয়তা, তার মৃত্যুদণ্ড এবং উইন্ডসরে সমাহিত হওয়া ব্রিটিশ ইতিহাসে এক গভীর ছাপ রেখে গেছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় উইন্ডসর ক্যাসেল রাজপরিবারের নিরাপদ আশ্রয় হয়ে ওঠে। জর্জ ষষ্ঠ তার পরিবারকে লন্ডনের বোমাবর্ষণ থেকে রক্ষা করতে এখানে রাখেন। তরুণ এলিজাবেথ ও মার্গারেট এখানেই যুদ্ধকালীন সময় কাটান, যা উইন্ডসরকে জাতীয় প্রতিরোধের প্রতীক বানায়। আধুনিক যুগেও রানী এলিজাবেথ দ্বিতীয় উইন্ডসরকে তার প্রিয় আবাস হিসেবে ব্যবহার করেছেন এবং কোভিড মহামারির সময় দীর্ঘ সময় এখানে অবস্থান করেছেন। তার মৃত্যুর পর সেন্ট জর্জেস চ্যাপেল জাতীয় শোকের কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

রাজনীতির ক্ষেত্রেও উইন্ডসর ক্যাসেলের গুরুত্ব অপরিসীম। এখানে অনুষ্ঠিত হয় রাষ্ট্রীয় ভোজ, কূটনৈতিক বৈঠক, নাইটহুড প্রদান এবং আন্তর্জাতিক অতিথিদের অভ্যর্থনা। ব্রিটিশ সফট-পাওয়ারের অন্যতম উৎস হিসেবে উইন্ডসর ক্যাসেল যুক্তরাজ্যের আন্তর্জাতিক মর্যাদা ও কূটনৈতিক সম্পর্ককে শক্তিশালী করে। বিশ্বের কোটি মানুষ উইন্ডসরকে ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের প্রতীক হিসেবে চেনে, যা দেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে আরও দৃঢ় করে।

উইন্ডসর ক্যাসেল তাই শুধু একটি স্থাপনা নয়; এটি ব্রিটিশ রাষ্ট্রের আত্মপরিচয়, রাজতন্ত্রের স্থায়িত্ব এবং রাজনৈতিক ইতিহাসের এক মহিমান্বিত স্মারক। এক হাজার বছরের ইতিহাসে এটি ক্ষমতা, সংকট মোকাবিলা, সাংস্কৃতিক গৌরব এবং জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। উইন্ডসর ক্যাসেলকে বোঝা মানে ব্রিটিশ রাজতন্ত্রকে বোঝা, আর রাজতন্ত্রকে বোঝা মানে যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসকে গভীরভাবে উপলব্ধি করা।

স্থাপত্যের দিক থেকে উইন্ডসর ক্যাসেল এক অনন্য মিশ্রণ। নরম্যান সামরিক স্থাপত্য, মধ্যযুগীয় গথিক নকশা, ভিক্টোরিয়ান যুগের পুনর্নির্মাণ এবং আধুনিক সংরক্ষণ—সব মিলিয়ে এটি এক জীবন্ত স্থাপত্য জাদুঘর। স্টেট অ্যাপার্টমেন্টস, সেন্ট জর্জেস চ্যাপেল, রাউন্ড টাওয়ার—প্রতিটি অংশই ইতিহাসের একেকটি অধ্যায়।

সেন্ট জর্জেস চ্যাপেল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এখানেই অনুষ্ঠিত হয়েছে বহু রাজকীয় বিবাহ, রাজকীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া এবং নাইটহুড প্রদান অনুষ্ঠান। ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে এর গুরুত্ব অপরিসীম।

উইন্ডসর ক্যাসেল আজও রাজপরিবারের সক্রিয় আবাসস্থল। রাজা চার্লস তৃতীয় এবং রাজপরিবারের সদস্যরা নিয়মিত এখানে অবস্থান করেন। রাজকীয় অনুষ্ঠান, রাষ্ট্রীয় ভোজ, কূটনৈতিক বৈঠক—সবই এই দুর্গে অনুষ্ঠিত হয়। একই সঙ্গে এটি বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র, যেখানে প্রতি বছর লাখো মানুষ ব্রিটিশ ইতিহাসের স্পর্শ পেতে আসে।

এক হাজার বছরের ইতিহাসে উইন্ডসর ক্যাসেল বহু যুদ্ধ, অগ্নিকাণ্ড, রাজনৈতিক সংকট এবং সামাজিক পরিবর্তনের সাক্ষী। তবুও এটি অটল দাঁড়িয়ে আছে—ব্রিটিশ রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব, রাজতন্ত্রের ধারাবাহিকতা এবং জাতির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক অমর প্রতীক হিসেবে।

উইন্ডসর ক্যাসেল শুধু একটি স্থাপনা নয়; এটি ব্রিটিশ জাতির আত্মপরিচয়, ইতিহাস এবং গৌরবের এক মহিমান্বিত স্মারক। এই দুর্গে জন্মেছে, বসবাস করেছে, শাসন করেছে এবং ইতিহাস রচনা করেছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজারা। উইন্ডসর ক্যাসেল শুধু একটি স্থাপনা নয়—এটি ব্রিটিশ রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব, রাজতন্ত্রের ধারাবাহিকতা এবং জাতির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক অমর প্রতীক।

উইন্ডসর ক্যাসেলের রাজকীয় টাইমলাইন (জন্ম–মৃত্যুর তারিখসহ)

১. উইলিয়াম দ্য কনকারার (William I)

জন্ম: ১০২৮ মৃত্যু: ৯ সেপ্টেম্বর ১০৮৭ গুরুত্ব: উইন্ডসর ক্যাসেলের প্রতিষ্ঠাতা; নরম্যান বিজয়ের পর দুর্গ নির্মাণ করেন। ১০৭০-এর দশকে তিনি উইন্ডসর ক্যাসেলের ভিত্তি স্থাপন করেন। নরম্যান বিজয়ের পর ইংল্যান্ডকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে এটি ছিল তার কৌশলগত দুর্গ।

২. হেনরি I (Henry I)

জন্ম: ১০৬৮ মৃত্যু: ১ ডিসেম্বর ১১৩৫ গুরুত্ব: উইন্ডসরকে রাজকীয় আবাস হিসেবে ব্যবহার শুরু করেন। প্ল্যান্টাজেনেট রাজবংশ উইন্ডসরকে রাজকীয় আবাস হিসেবে গড়ে তোলে। হেনরি II দুর্গের প্রথম বড় সম্প্রসারণ করেন।

৩. হেনরি II (Henry II)

জন্ম: ৫ মার্চ ১১৩৩ মৃত্যু: ৬ জুলাই ১১৮৯ গুরুত্ব: দুর্গের প্রথম বড় সম্প্রসারণ করেন।

৪. এডওয়ার্ড III (Edward III)

জন্ম: ১৩ নভেম্বর ১৩১২ মৃত্যু: ২১ জুন ১৩৭৭ গুরুত্ব: উইন্ডসরকে তার প্রধান আবাস বানান; সেন্ট জর্জেস চ্যাপেল প্রতিষ্ঠা করেন; নাইটহুডের কেন্দ্র গড়ে ওঠে। তিনি উইন্ডসর ক্যাসেলকে তার প্রধান আবাসস্থল করেন এবং সেন্ট জর্জেস চ্যাপেল প্রতিষ্ঠা করেন। এডওয়ার্ড III–এর সময়েই উইন্ডসর রাজকীয় অনুষ্ঠান ও নাইটহুডের কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

৫. হেনরি VIII (Henry VIII)

জন্ম: ২৮ জুন ১৪৯১ মৃত্যু: ২৮ জানুয়ারি ১৫৪৭ গুরুত্ব: টিউডর যুগে উইন্ডসর ছিল তার সামরিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতীক। হেনরি VIII উইন্ডসরকে তার সামরিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেন। তিনি এখানে বহু গুরুত্বপূর্ণ সভা ও রাজকীয় অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন।

৬. এলিজাবেথ I (Elizabeth I)

জন্ম: ৭ সেপ্টেম্বর ১৫৩৩ মৃত্যু: ২৪ মার্চ ১৬০৩ গুরুত্ব: স্প্যানিশ আর্মাডার সময় উইন্ডসর ছিল তার নিরাপদ আশ্রয়। তিনি এখানে দীর্ঘ সময় অবস্থান করেন এবং রাজনীতি পরিচালনা করেন।

৭. চার্লস I (Charles I)

জন্ম: ১৯ নভেম্বর ১৬০০ মৃত্যু: ৩০ জানুয়ারি ১৬৪৯ গুরুত্ব: সিভিল ওয়ারের কেন্দ্রীয় চরিত্র; মৃত্যুদণ্ডের পর উইন্ডসরে সমাহিত। চার্লস I–কে মৃত্যুদণ্ডের পর তার দেহ উইন্ডসর ক্যাসেলে সমাহিত করা হয়। সিভিল ওয়ারের সময় উইন্ডসর ছিল রাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্র।

৮. জর্জ III (George III)

জন্ম: ৪ জুন ১৭৩৮ মৃত্যু: ২৯ জানুয়ারি ১৮২০ গুরুত্ব: উইন্ডসরকে রাজপরিবারের প্রধান আবাসে পরিণত করেন।

৯. জর্জ IV (George IV)

জন্ম: ১২ আগস্ট ১৭৬২ মৃত্যু: ২৬ জুন ১৮৩০ গুরুত্ব: আধুনিক উইন্ডসর ক্যাসেলের স্থাপত্যের মূল রূপ দেন; স্টেট অ্যাপার্টমেন্টস নির্মাণ। তিনি উইন্ডসরকে তার স্থায়ী বাসস্থান করেন। তার সময়েই দুর্গে বড় সংস্কার ও সম্প্রসারণ হয়। তিনি দুর্গকে আজকের রাজকীয় প্রাসাদের রূপ দেন, স্টেট অ্যাপার্টমেন্টস, গ্র্যান্ড রিসেপশন রুম—সবই তার সময়ের নকশা।

১০. রানী ভিক্টোরিয়া (Queen Victoria)

জন্ম: ২৪ মে ১৮১৯ মৃত্যু: ২২ জানুয়ারি ১৯০১ গুরুত্ব: উইন্ডসরকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের হৃদয় বানান; রাজকীয় অনুষ্ঠান ও কূটনৈতিক কেন্দ্র। ভিক্টোরিয়ান যুগে উইন্ডসর ক্যাসেল ছিল রাজকীয় অনুষ্ঠান, কূটনৈতিক বৈঠক এবং সাম্রাজ্যের প্রতীক। তিনি এখানে দীর্ঘ সময় বসবাস করেন।

১১. জর্জ V (George V)

জন্ম: ৩ জুন ১৮৬৫ মৃত্যু: ২০ জানুয়ারি ১৯৩৬ গুরুত্ব: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় উইন্ডসর ছিল রাজপরিবারের নিরাপদ কেন্দ্র।

১২. জর্জ VI (George VI)

জন্ম: ১৪ ডিসেম্বর ১৮৯৫ মৃত্যু: ৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ গুরুত্ব: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রাজপরিবার উইন্ডসরে আশ্রয় নেয়; এলিজাবেথ ও মার্গারেট এখানে যুদ্ধকালীন সময় কাটান।

১৩. রানী এলিজাবেথ II (Queen Elizabeth II)

জন্ম: ২১ এপ্রিল ১৯২৬ মৃত্যু: ৮ সেপ্টেম্বর ২০২২ গুরুত্ব: উইন্ডসর ছিল তার প্রিয় আবাস; কোভিড মহামারির সময় দীর্ঘ অবস্থান; সেন্ট জর্জেস চ্যাপেলে সমাহিত। তিনি উইন্ডসর ক্যাসেলে বহু সময় কাটিয়েছেন এবং এটিকে তার ব্যক্তিগত আবাস হিসেবে ব্যবহার করেছেন। কোভিড মহামারির সময় তিনি দীর্ঘ সময় এখানে অবস্থান করেন। তার মৃত্যুর পর সেন্ট জর্জেস চ্যাপেলে তাকে সমাহিত করা হয়েছে।

১৪. রাজা চার্লস III (King Charles III)

জন্ম: ১৪ নভেম্বর ১৯৪৮ গুরুত্ব: বর্তমান রাজা; উইন্ডসর ক্যাসেলে নিয়মিত অবস্থান করেন; রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। চার্লস III নিয়মিত উইন্ডসর ক্যাসেলে অবস্থান করেন এবং রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। এটি এখনো রাজপরিবারের সক্রিয় আবাসস্থল।

উইন্ডসর ক্যাসেল: এক হাজার বছরের রাজকীয় ধারাবাহিকতা

এই দুর্গে জন্মেছে, বসবাস করেছে, শাসন করেছে এবং ইতিহাস রচনা করেছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজারা। উইন্ডসর ক্যাসেল শুধু একটি স্থাপনা নয়—এটি ব্রিটিশ রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব, রাজতন্ত্রের ধারাবাহিকতা এবং জাতির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক অমর প্রতীক।

নিউজ ডেস্ক: টিভি থ্রি বাংলা

Categories
আমেরিকা বাংলাদেশ

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সরকারের পাশে যুক্তরাষ্ট্র, যেকোনো সহায়তার আশ্বাসঃ সারাহ আলড্রিচ

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সরকারের পাশে যুক্তরাষ্ট্র রয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী যেকোনো ধরনের সহযোগিতা দিতে ওয়াশিংটন প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক ব্যুরোর ভারপ্রাপ্ত পরিচালক সারাহ আলড্রিচ।

গত ২৮ আগস্ট ওয়াশিংটন ডিসিতে বাংলাদেশ দূতাবাস আয়োজিত জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীর স্মরণসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। পরে ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা—বাসস এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

সারাহ আলড্রিচ বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং বর্তমানে একটি নির্বাচিত সরকার দেশ পরিচালনা করছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, জুলাই-পরবর্তী নানা জটিলতা অতিক্রম করে অন্তর্বর্তী সরকার অল্প সময়ের মধ্যে একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করেছে।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যকার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ইতোমধ্যে শক্তিশালী হয়েছে। একই সঙ্গে দুই দেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব আরও জোরদার করতে যুক্তরাষ্ট্র আগ্রহী।

জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগের কথাও স্মরণ করেন মার্কিন এই কর্মকর্তা। তিনি জুলাইয়ের চেতনায় বাংলাদেশকে কৃষি, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আরও এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান এবং বাংলাদেশের ক্রমাগত উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি কামনা করেন।

স্মরণসভায় আটলান্টিক কাউন্সিলের সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যানও বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে, তা বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও প্রভাব ফেলেছে। তার মতে, এই কারণে বাংলাদেশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আন্তর্জাতিক গুরুত্ব রয়েছে।

অনুষ্ঠানের শুরুতে জুলাই আন্দোলনে নিহতদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। পরে আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণ, অবদান ও আত্মত্যাগ তুলে ধরে নির্মিত তথ্যচিত্র ‘জুলাইকন্যা’ প্রদর্শন করা হয়।

স্মরণসভায় বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিক, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, প্রবাসী বাংলাদেশি এবং বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন।

সারাহ আলড্রিচের বক্তব্যে একই সঙ্গে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা উঠে এসেছে—একদিকে বাংলাদেশের বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের কথা জানানো, অন্যদিকে ঢাকা ও ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করার আগ্রহ প্রকাশ করা। ফলে তার বক্তব্যকে দুই দেশের ভবিষ্যৎ দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা সম্প্রসারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সূত্রঃ বাসস

এম.কে

Categories
আন্তর্জাতিক

ইরানের পাশে রাশিয়া—গোপন ‘সি৪৩০এল’ প্রকল্পে সুপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি দিচ্ছে মস্কো

ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে ড্রোনসহ সামরিক সহায়তা দেওয়ার পর এবার ইরানের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে রাশিয়া। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মস্কো গোপনে ইরানকে উন্নত সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির প্রযুক্তি ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে।

ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের হাতে আসা রুশ নথি, কর্মকর্তাদের ভ্রমণ-তথ্য এবং সামরিক পেটেন্ট বিশ্লেষণের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বহু বছরের এই গোপন কর্মসূচির সাংকেতিক নাম ‘সি৪৩০এল’। প্রকল্পটি ২০২৩ সালে শুরু হয় এবং ২০২৬ সাল পর্যন্ত এর কার্যক্রম অব্যাহত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য ইরানকে র‍্যামজেট প্রপালশন প্রযুক্তি আয়ত্ত করতে সহায়তা করা। র‍্যামজেট এমন এক ধরনের ইঞ্জিন, যা ক্ষেপণাস্ত্রকে উড্ডয়নের সময় বাতাস ব্যবহার করে অত্যন্ত উচ্চ গতিতে চলতে সক্ষম করে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র শব্দের কয়েক গুণ গতিতে দীর্ঘ সময় উড়তে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রযুক্তি মূলত জাহাজবিধ্বংসী ও স্থলভাগে আঘাত হানতে সক্ষম ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রে ব্যবহারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটি পরিচালনায় রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় অস্ত্র রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান রসোবোরোনএক্সপোর্ট এবং ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এনপিও মাশিনোস্ত্রোয়েনিয়ার ভূমিকা রয়েছে। রুশ ক্ষেপণাস্ত্র বিশেষজ্ঞদের কয়েকজন ইরানে একাধিকবার সফর করেছেন এবং প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক চুক্তি ২০২৩ সালের নভেম্বরে ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে সম্পন্ন হয়।

নথিতে আরও দেখা গেছে, ২০২৫ সালের মধ্যে ইরান র‍্যামজেট ব্যবস্থা নিয়ে বিপুল পরিমাণ প্রযুক্তিগত তথ্য রুশ প্রকৌশলীদের কাছে পাঠায়। রুশ বিশেষজ্ঞরা ইরানের একটি উড্ডয়ন পরীক্ষার তথ্য বিশ্লেষণ করে জ্বালানি ব্যবস্থা, দহন স্থিতিশীলতা, বায়ুপ্রবেশ ব্যবস্থা এবং ইঞ্জিনের অগ্রভাগসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন। অর্থাৎ শুধু নকশা বা প্রযুক্তি হস্তান্তর নয়, ইরানের তৈরি ব্যবস্থার কারিগরি সমস্যাগুলো সমাধানেও রুশ প্রকৌশলীরা সরাসরি কাজ করেছেন বলে নথিতে ইঙ্গিত রয়েছে।

২০২৫ সালের এপ্রিলে রসোবোরোনএক্সপোর্ট প্রায় দুই ডজন রুশ বিশেষজ্ঞকে ইরানে পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৬ সালেও দুই দেশের মধ্যে প্রকল্পটির পরবর্তী ধাপ নিয়ে আলোচনা এবং রুশ প্রযুক্তিগত প্রতিবেদন তৈরির তথ্য পাওয়া গেছে।

এই সহযোগিতার গুরুত্ব আরও বেড়ে যায় ইরানের দীর্ঘদিনের সুপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির প্রচেষ্টার কারণে। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান বহু বছর ধরে এই প্রযুক্তি অর্জনের চেষ্টা করছে। দেশটি এরই মধ্যে একটি র‍্যামজেট ইঞ্জিন তৈরি ও পরীক্ষাও করেছে। তবে রুশ সহায়তায় তৈরি কোনো সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ইতোমধ্যে ইরানের সামরিক বাহিনীতে কার্যকরভাবে মোতায়েন হয়েছে—এমন প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।

ব্রিটিশ অস্ত্র গবেষণা সংস্থা কনফ্লিক্ট আর্মামেন্ট রিসার্চের ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র বিশেষজ্ঞ ফাবিয়ান হিনৎসের মতে, এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল কৌশলগত সামরিক প্রযুক্তি হস্তান্তরের ঘটনা। তার মতে, র‍্যামজেটভিত্তিক কার্যকর অস্ত্র তৈরি করা অত্যন্ত কঠিন এবং এ ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ রুশ প্রকৌশলীদের সরাসরি সহায়তা ইরানের জন্য বড় ধরনের প্রযুক্তিগত সুবিধা তৈরি করতে পারে।

ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটেও এই সহযোগিতার আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। যুদ্ধের সময় ইরানের তৈরি শাহেদ হামলাকারী ড্রোন রাশিয়ার হাতে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে এবং রাশিয়াকে নিজস্ব ভূখণ্ডে এসব ড্রোন উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তুলতেও ইরান সহায়তা করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ফলে দুই দেশের সামরিক সম্পর্ক এখন শুধু অস্ত্র কেনাবেচা বা সরবরাহের পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই; বরং উন্নত অস্ত্র প্রযুক্তি, প্রকৌশল জ্ঞান ও উৎপাদন সক্ষমতা ভাগাভাগির দিকে এগোচ্ছে। ইরান যদি র‍্যামজেট প্রযুক্তি পুরোপুরি আয়ত্ত করতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে একই প্রযুক্তিকে ভিত্তি করে নিজেদের আরও উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি ও পরিবর্তন করার সক্ষমতা অর্জন করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের কাছে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো পারস্য উপসাগর ও মধ্যপ্রাচ্যের সামুদ্রিক নিরাপত্তা। সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র দ্রুতগতিতে নিচু উচ্চতায় এগোতে পারলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কাছে শনাক্ত, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাধা দেওয়ার জন্য সময় কমে যায়। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের যুদ্ধজাহাজ, সামরিক ঘাঁটি এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার জন্য এমন অস্ত্র ভবিষ্যতে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

সব মিলিয়ে ‘সি৪৩০এল’ প্রকল্প রাশিয়া-ইরান সামরিক সম্পর্কের একটি নতুন মাত্রা সামনে এনেছে। ইরান যেমন ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে ড্রোন প্রযুক্তি ও অস্ত্র সহায়তা দিয়েছে, তেমনি রাশিয়া এখন ইরানের দীর্ঘদিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত ঘাটতি পূরণে সহায়তা করছে বলে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। এর ফলে ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ভারসাম্য, বিশেষ করে সমুদ্রভিত্তিক শক্তির সমীকরণ, আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

সূত্রঃ ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস

এম.কে

Categories
যুক্তরাজ্য (UK)

যুক্তরাজ্যে লাখো মানুষের জন্য প্যারাসিটামল সতর্কতা—নিয়মিত সেবনে বাড়তে পারে ঝুঁকি

মাথাব্যথা, জ্বর কিংবা বিভিন্ন ধরনের ব্যথা কমাতে যুক্তরাজ্যে বহুল ব্যবহৃত প্যারাসিটামল নিয়ে নতুন করে সতর্কতা সামনে এসেছে। নিয়মিত ও দীর্ঘমেয়াদি প্যারাসিটামল সেবন করলে বিশেষ করে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত মানুষের রক্তচাপ আরও বেড়ে যেতে পারে এবং এর মাধ্যমে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের মতো গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।

বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কারণ প্যারাসিটামল দীর্ঘদিন ধরে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ ব্যথানাশক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। বিশেষ করে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথায় আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে এটি নিয়মিত ব্যবহারের জন্য দেওয়া হয়। কিন্তু এডিনবরো বিশ্ববিদ্যালয় ও এনএইচএস লোথিয়ানের গবেষকদের পরিচালিত ‘পাথ-বিপি’ গবেষণা নিয়মিত প্যারাসিটামল ব্যবহারের সঙ্গে রক্তচাপ বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তুলে ধরে।

গবেষণায় উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত ১১০ জনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। তাদের একদলকে দুই সপ্তাহ প্রতিদিন মোট ৪ গ্রাম প্যারাসিটামল দেওয়া হয় এবং অন্য সময় একই অংশগ্রহণকারীদের প্লাসিবো দেওয়া হয়। গবেষণাটি ছিল নিয়ন্ত্রিত ও দ্বৈত-অন্ধ পদ্ধতিতে পরিচালিত। ১০৩ জন অংশগ্রহণকারী উভয় পর্যায় সম্পন্ন করেন।

ফলাফলে দেখা যায়, নিয়মিত প্যারাসিটামল গ্রহণের সময় অংশগ্রহণকারীদের দিনের গড় সিস্টোলিক রক্তচাপ প্লাসিবোর তুলনায় প্রায় ৪ দশমিক ৭ মিলিমিটার পারদ বেশি বেড়েছিল। ডায়াস্টোলিক রক্তচাপও প্রায় ১ দশমিক ৬ মিলিমিটার পারদ বৃদ্ধি পায়। ২৪ ঘণ্টার রক্তচাপ পরিমাপেও একই ধরনের প্রবণতা পাওয়া যায়।

গবেষকদের মতে, প্রায় ৫ মিলিমিটার পারদ সিস্টোলিক রক্তচাপ বৃদ্ধি ছোট বলে মনে হলেও উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এটি হৃদ্‌যন্ত্র ও রক্তনালিসংক্রান্ত ঝুঁকির ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। গবেষণাটি তাই উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি ও নিয়মিত প্যারাসিটামল ব্যবহারের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

এডিনবরো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল ফার্মাকোলজির অধ্যাপক জেমস ডিয়ার জানিয়েছেন, প্যারাসিটামল রক্তচাপ বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে এবং উচ্চ রক্তচাপ নিজেই হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের অন্যতম প্রধান ঝুঁকি। তাই বিশেষ করে হৃদরোগের ঝুঁকিতে থাকা রোগীদের ক্ষেত্রে চিকিৎসক ও রোগীর একসঙ্গে ওষুধটির সম্ভাব্য উপকারিতা ও ঝুঁকি বিবেচনা করা উচিত।

তবে এই সতর্কতা মাঝেমধ্যে প্যারাসিটামল ব্যবহারের ক্ষেত্রে নয়। গবেষণার প্রধান তদন্তকারী চিকিৎসক ইয়ান ম্যাকইনটায়ারের বক্তব্য অনুযায়ী, মাথাব্যথা বা জ্বরের মতো সাধারণ সমস্যায় স্বল্পমেয়াদে প্যারাসিটামল গ্রহণ নিয়ে সাধারণ মানুষের আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। মূল উদ্বেগ হলো দীর্ঘ সময় ধরে নিয়মিত ওষুধটি ব্যবহার করা, বিশেষ করে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথার চিকিৎসায়।

গবেষণার আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, অংশগ্রহণকারীরা প্যারাসিটামল বন্ধ করার পর তাদের রক্তচাপ আবার গবেষণার শুরুতে থাকা মাত্রার কাছাকাছি ফিরে যায়। গবেষকদের কাছে এটি ওষুধটির সঙ্গে রক্তচাপ বৃদ্ধির সম্পর্কের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

যুক্তরাজ্যে উচ্চ রক্তচাপও অত্যন্ত সাধারণ একটি স্বাস্থ্য সমস্যা। প্রতিবেদনে উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, দেশটির প্রায় প্রতি তিনজন প্রাপ্তবয়স্কের একজন উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত। ইংল্যান্ডে প্রায় ৩১ শতাংশ পুরুষ এবং ২৬ শতাংশ নারী উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। আর গবেষকদের হিসাবে, যুক্তরাজ্যে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত প্রতি তিনজন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে প্রায় একজন নিয়মিত প্যারাসিটামল সেবন করতে পারেন।

এ কারণে বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘমেয়াদি প্যারাসিটামল ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা নিয়মিত পর্যালোচনার পরামর্শ দিয়েছেন। ব্রিটিশ হার্ট ফাউন্ডেশনের মেডিকেল ডিরেক্টর অধ্যাপক স্যার নিলেশ সামানিও বলেছেন, কোনো ওষুধ দীর্ঘদিন চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন আছে কি না, তা চিকিৎসক ও রোগীর নিয়মিত পর্যালোচনা করা উচিত এবং প্রতিবার সম্ভাব্য উপকারিতা ও ঝুঁকির ভারসাম্য বিবেচনা করা প্রয়োজন।

গবেষকদের পরামর্শ হলো, দীর্ঘমেয়াদি ব্যথার জন্য প্যারাসিটামল প্রয়োজন হলে কার্যকর সর্বনিম্ন মাত্রা এবং সবচেয়ে কম প্রয়োজনীয় সময়ের জন্য ওষুধটি ব্যবহার করা উচিত।

তবে গবেষণাটি প্যারাসিটামলকে সম্পূর্ণভাবে ‘বিপজ্জনক’ ওষুধ হিসেবে ঘোষণা করছে না। বরং ফলাফলটি বিশেষ করে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত এবং দীর্ঘদিন নিয়মিত প্যারাসিটামল গ্রহণকারী রোগীদের জন্য চিকিৎসকের সঙ্গে ওষুধের প্রয়োজনীয়তা ও ঝুঁকি পর্যালোচনার গুরুত্ব তুলে ধরছে।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শঃ দীর্ঘদিন প্যারাসিটামল গ্রহণ করলে চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের সঙ্গে কথা বলে রক্তচাপ, প্রয়োজনীয় মাত্রা এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের ঝুঁকি পর্যালোচনা করা উচিত।

সূত্রঃ ২০২২ সালে সার্কুলেশন সাময়িকীতে প্রকাশিত ‘পাথ-বিপি’ গবেষণা। গবেষণাটি ব্রিটিশ হার্ট ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে পরিচালিত হয়েছিল।

এম.কে